mukti

১৩৬ বছরের বৃদ্ধ নূর আহাম্মদ। ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে এলাকার যুবকদের সংগঠিত করে সক্রিয়ভাবে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সনদ গ্রহণ না করায় মিলছে না ভাতা, এমনকি বয়স্ক ভাতা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন তিনি। শেষ জীবনে সাহসী এ সৈনিক অনেকটাই অসহায় জীবন যাপন করছেন।

নূর আহাম্মদ ১৮৮২ সালের ১১ জানুয়ারি ছাগলনাইয়া উপজেলার মহামায়া ইউনিয়নের সত্যনগর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা মৃত আবদুল মজিদ ও মাতা নুরের নেছা বড় সন্তান নূর আহাম্মদ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কৃষ্ণনগর প্রাইমারি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে লেখাপড়ায় বেশিদূর এগোতে পারেননি। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শত বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজো বেঁচে আছেন তিনি।
বঙ্গভঙ্গ বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের আদেশে বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন হয়। ১৯১১ সালে প্রচণ্ড গণআন্দোলনের মুখে বঙ্গভঙ্গ বাতিল হয়। যুবক নূর আহাম্মদ তখন ওই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে আবারও বঙ্গভঙ্গ হয়ে পূর্ব বঙ্গ পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়।

নূর আহাম্মদ জানান, ব্রিটিশ সরকার রাষ্ট্র চালানোর জন্য দেশ ভাগ করে। আঠারো শতকের শেষের দিকে প্রতি কেজি চাল ১ পয়সায় পাওয়া যেত যা উনিশ শতকের প্রথম অংশে বেড়ে দেড় টাকা হয়।

স্থানীয়রা জানায়, নূর মিয়া (নূর আহাম্মদ) অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের মানুষ। কারোর সঙ্গে কখনো ঝগড়া বিবাদ হয়নি। মানুষকে সবসময় ভালো কাজের জন্য পরামর্শ দিতেন। এক ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে অতি কষ্টে জীবন অতিবাহিত করেছেন বছরের পর বছর। নিজ জমি ও অন্যের জমিতে চাষ করে ছেলে মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন তিনি। মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন সে অনেক আগে। ছেলে রাজধানীতে চাকরি করে সেখানে অবস্থান করছেন।

নূর মিয়া বলেন, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গ্রামের অনেকে ভারতে আশ্রয় নিলেও তিনি গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাননি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে গ্রামের যুবকদের একত্রিত করে যুদ্ধে অংশ নিতে প্রস্তুতি নেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে দিক নির্দেশনা দিতেন। বক্তৃতা দিয়ে তাদের উদ্ধুদ্ধ করতেন।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, একদিন পাক বাহিনীরা তাকে রাস্তা দিয়ে হাটার সময় দাঁড় করিয়ে বলেছিলেন ‘হামারা মুসলমান হায়, তোমারা মুসলমান, মুক্তি পোছ কেয়া ছিচায়’। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জিয়াউর রহমান ছাগলনাইয়া এসেছিলেন। সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমিও বক্তব্য দিয়ে বলেছিলাম, হুসিয়ার থেকো, হিম্মত রাখো; জয় আমাদেরই হবে।

নুর আহাম্মদের প্রথম স্ত্রী হেঞ্জুরেন নেছা বাচ্চা প্রসবের সময় মারা যান। এরপর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন আমেনা বেগমকে। তিনিও ৯০ বছর বয়সে ১৯৯৮ সালে সেপ্টেম্বর মাসে মারা যান।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশর, তিনি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেই সংসার ও ছেলে মেয়ের পড়াশুনার খরচ চালাতেন। নূর আহাম্মদ মিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুবই ভক্ত ছিলেন। যেকোন আন্দোলন সংগ্রামের ডাক এলেই তিনি তা পালন করার জন্য উঠে পড়ে লাগতেন।

সত্তর বছর বয়সী ছেলে আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের কর্মচারী খায়ের আহম্মেদ জানান, আমার বাব মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেও কোনো সার্টিফিকেট পাননি। এ বৃদ্ধ বয়সে কোনো ধরণের ভাতা তিনি পান না। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার সোহেল জানান, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি যাতে অল্প সময়ের মধ্যে বয়স্ক ভাতা পান সে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য তিনি আবেদন করলে উনাকে সব ধরণের সহযোগিতা করা হবে।