supreme-court

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে গত প্রায় তিন বছর ধরে বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না। অন্তত পাঁচজন বিচারপতির পদ শূন্য থাকলেও নতুন কোনো বিচারপতি নিয়োগ পাচ্ছেন না। পদত্যাগ ও অবসরে যাওয়ার ফলে বিচারপতির সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাড়ছে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা। আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।

প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতির অভাবে আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির জন্য বেঞ্চের সংখ্যা কমিয়ে একটি করা হয়েছে। যে হারে মামলা বাড়ছে তাতে বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়ে আপিল বিভাগে আরও কমপক্ষে দুটি বেঞ্চ গঠন করা দরকার বলেও মতামত দিয়েছেন আইনজ্ঞরা। তারা মনে করেছেন, আপিল বিভাগে দ্রুত বিচারক নিয়োগ করে বিচারপতি সংকটের এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে হবে। অন্যথায় আপিল বিভাগে মামলার সংখ্যা বেড়ে জট সৃষ্টি হতে পারে।
আপিল বিভাগে বর্তমানে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে মাত্র চারজন বিচারপতি শত শত মামলা পরিচালনা করছেন। আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিগণ হলেন- বিচারপতি ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। এদিকে গত ৩০ মে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার পর বর্তমানে বিচারপতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে একশ একজনে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা দায়িত্বে থাকা অবস্থায় আপিল বিভাগে নিয়মিত দুটি বেঞ্চে মামলা নিষ্পত্তি করা হতো। এর মধ্যে একটি বেঞ্চের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। অপর বেঞ্চের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা। গত ১০ নভেম্বর পদত্যাগ করেন এসকে সিনহা। এরপর ২ ফেব্রুয়ারি দেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ওইদিনই পদত্যাগ করে চলে যান ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা।

সিনিয়র আইনজ্ঞরা বলছেন, আপিল বিভাগে ১০ থেকে ১৫ জন বিচারপতি নিয়োগ দেয়া যেতে পারে এবং কমপক্ষে তিনটি বেঞ্চ পরিচালিত হওয়া দরকার। ইংল্যান্ডের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ১৫ জন বিচারপতি বিচারিক কাজ পরিচালনা করেন বলেও জানা গেছে। তবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে উল্লেখযোগ্য বা সুনির্দিষ্ট বিচারপতির সংখ্যা নেই। প্রয়োজনের তাগিদে বিচারপতি নিয়োগের সংখ্যা কমবেশি করা যেতে পারে।

সাত বছর আগেও আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন। ২০১৬ সালের দিকেও আপিল বিভাগে বিচারপতি ছিলেন নয়জন। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান ইন্তেকাল করেন। বাকি আটজনের মধ্যে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ২০১৭ সালের ৭ জুলাই এবং বিচারপতি মো. নিজামুল হক ১৪ মার্চ অবসরে যান। সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা অবসরের আগেই পদত্যাগ করেন। সর্বশেষ ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞাও পদত্যাগ করেন। এখন রয়েছেন মাত্র চারজন।

তথ্য অনুযায়ী, সাংবিধানিক মামলাসহ আপিল বিভাগে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মামলার সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৫৬৫টি। হাইকোর্ট বিভাগে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চার লাখ ৭৬ হাজার ৭৫০টি মামলা ছিল। আপিল বিভাগের সবর্শেষ তথ্য ও বর্তমান হিসাবে অনুযায়ী, এ সংখ্যা ১৮ হাজার ২৪৬টিতে গিয়ে ঠেকেছে। এসব মামলা নিষ্পত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগের পর এখন আপিল বিভাগেও বিচারক নিয়োগের কোনো বিকল্প নেই বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।

তারা জানান, আপিল বিভাগে যে সংখ্যক মামলা রয়েছে দ্রুত তা নিষ্পত্তিতে বিচারক নিয়োগ প্রয়োজন। চারজন বিচারক দিয়ে আপিল বিভাগের দুটি বেঞ্চ গঠন সম্ভব নয়। দুটি বেঞ্চ গঠন করতে আরও বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে। এছাড়া শুধুমাত্র দুটি বেঞ্চ-ই নয়, গঠন করা যেতে পারে তিনটি বেঞ্চ। তা হলে মামলা নিষ্পত্তিতে গতি পাবে এবং মামলা জট কমবে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার  বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পাঁচজন বিচারপতি নিয়োগ করা যেতে পারে, আবার ১৫ জন বিচারপতিও নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এর ব্যাখায় তিনি বলেন, আপিল বিভাগে তিনটি বেঞ্চ থাকলে তারা (ক্রিমিনাল রিট ও সিভিল) পৃথক এই তিন ধরনের মামলা পরিচালনা করতে পারবেন।

যুক্তরাজ্যের উদাহরণ টেনে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ইংল্যান্ডের আপিল বিভাগে ১৫ জন বিচারপতি রয়েছেন। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের আপিল বিভাগে আরও বিচারপতি নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।

এছাড়া সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগের কোনো নিয়ম-নীতিমালা নেই বলেও অভিযোগ তোলেন এই সিনিয়র আইনজীবী ও সাবেক স্পিকার। তিনি বলেন, আশা করছি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিচারপতি নিয়োগের নীতিমালা করে আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ গুরুত্বসহকারে দেখবেন।

আপিল বিভাগে কবে নাগাদ বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে, তা কেউ নিশ্চিত না করলেও খুব শিগগিরই বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক।

আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক  বলেন, বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে রাষ্ট্রপতির ওপর। তিনি বিচারপতি নিয়োগ করলে আমরা প্রজ্ঞাপন জারি করবো। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার পর নির্দেশনা আসলে সে অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ  বলেন, যেভাবে মামলার সংখ্যা বাড়ছে তাতে জট কমানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ দেয়া দরকার। আপিল বিভাগে যেখানে ১১ জন বিচারক থাকার বিধান রয়েছে সেখানে আছেন মাত্র চারজন। তাই আশা করছি সহসাই বিচারক নিয়োগ দেয়া হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে কতজন বিচারপতি নিয়োগের বিধান রয়েছে এবং কতজনকে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাতজন, নয়জন থেকে ১১ জন পর্যন্ত বিচারপতি নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। তবে বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের ইচ্ছা।

এ বিষয়ে আইন, মানবাধিকার ও সংবিধানবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব কাজী আব্দুল হানান  বলেন, সংখ্যার বিচারে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগ দেয়া হয় না। আপিল বিভাগে নয়জন, সাতজন এমনকি পাঁচজন বিচারপতি নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। তবে তিনজন বিচারপতির সমন্বয়ে আপিল বিভাগের বেঞ্চ গঠন করার বিধান।

তিনি জানান, সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এবং হাইকোর্ট উভয় বিভাগে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ করা নেই। প্রয়োজনে প্রধান বিচারপতির পরামর্শে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। সংবিধানের ৯৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ ও নিয়োগ করে থাকেন। ভারতেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সেখানেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এবং হাইকোর্ট উভয় বিভাগে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ করা নেই।