tiger

বাংলাদেশ এগুচ্ছে, বাংলাদেশ পিছাচ্ছে। বাংলাদেশের নারীরা এগুচ্ছে, বাংলাদেশের নারীরা পিছাচ্ছে। এমনি এক ‘টু বি অর নট টু বি’ এর হিসাবের মাঝে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশের উন্নয়নের চাকা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কেউ কেউ অস্বীকার করলেও ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিশেষ করে ক্রিকেটে বাংলাদেশ টিমের উন্নয়নকে এখনও পর্যন্ত কেউ অস্বীকার করতে পারেন নি এক কথায়, বিনা যুক্তিতে। যেমন এগিয়েছে আমাদের পুরুষ ক্রিকেট দল ঠিক তার সাথে পাল্লা দিয়ে এগুচ্ছে আমাদের নারী ক্রিকেট দলও।

বাংলাদেশে নারী ক্রিকেটের যাত্রা খুব বেশীদিনের না। প্রচণ্ড অবহেলা আর অযত্নেই এগিয়ে চলছে এই জায়গাটি। সালমা, জাহানারাদের ইতিহাস খুব একটা সুখকর নয়। সুযোগ সুবিধার তেমন কিছুই তারা পায় না। এমনকি পুরুষ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের বেতন যখন লাখ টাকায় হিসাব করা হয় তখন আমাদের এই অবহেলিত নারীদেরকে ফেলা হয় শতকের অংকের হিসাবে। প্রশংসার তেমন কিছু না পেলেও হারলে কথা শুনাতে কেউ ছাড় দেয়নি এতদিন।

এশিয়া কাপ জয়ের মত একটি বিরল সম্মান এখন মেয়েদের হাত ধরেই এসেছে। কোন পুরুষের দল আনে নি। নারীদেরকে পিছিয়ে ফেলতে চায় যারা তাদের মুখে চার ছয়ের সাইনবোর্ড পরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, যাবে আমাদের সোনার বাংলার সোনার মেয়েরা। লাভ ইউ টিম টাইগার্স। তোমরাই বাংলাদেশ, তোমরাই পারো বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে

শত প্রতিকূলতার মাঝেও আশা ছাড়েনি আমাদের কন্যারা। বাঘের মতই শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলেছে তারা। বুকে কেবল একটাই স্বপ্ন তাদের। একদিন তারাও জানান দিবে নিজেদের নাম গোটা দুনিয়ার সামনে। এই একটি দলের জয়ে তেমন কোন সাড়া পড়েনা আবার পরাজয়েও কেউ খোঁজ রাখার মত আগ্রহ পায় নি।

কিন্তু সে দিনের শেষ হতে চলেছে। এক নতুন “টিম টাইগ্রেস”দেখছি আমরা। এশিয়া কাপের এ পর্যন্ত যতগুলো টুর্নামেন্ট হয়েছে তার সবকটিতেই চ্যাম্পিয়নের নামের জায়গায় ভারতের নাম লেখা। ক্রিকেট দুনিয়ায় ভারত এক পরাশক্তির নাম। সেই দলকেই আমাদের লাল সবুজের পোশাক পরা প্রজাপতিরা একই টুর্নামেন্টে কেবল একবার নয়, দুইবার হারিয়েছে। ৬ বারের চ্যাম্পিয়নের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছে ট্রফি। এরপর আর কেউ এশিয়া কাপের একক মালিক হিসাবে ভারতের নাম নিবে না। থাকবে বাংলাদেশের নামও।

এরপর থেকে আমাদের এই রুগ্ন শরীরের মেয়েদের কেউ অবহেলার সাহস দেখাবে না। গোটা বিশ্বের খবরের কাগজে হেডলাইন লেখা হয়ে যাচ্ছে, নারী ক্রিকেটের নতুন শক্তির নাম বাংলাদেশ। যেকোন ফর্মেটেই এই প্রথমবারের মত এশিয়া কাপ জিতে নিয়েছে আমাদের বাংলাদেশ। এনেছে বাংলার দামাল নারীরা। “দামাল” শব্দটি এতদিন কেবল পুরুষের সমার্থক হিসেবেই পরিচিত ছিলো। কিন্তু মেয়েরাও দামাল হয়, করে দেখিয়েছে সালমার দল।

সে এক শ্বাস্রুদ্ধকর ম্যাচ। অফিসে বসেই অনলাইনে দেখছিলাম খেলা। সকাল থেকেই একধরনের উত্তেজনা কাজ করছিলো ম্যাচটিকে ঘিরে। পারবে কী আমাদের মেয়েরা ইতিহাস গড়তে? মালয়েশিয়ার মাঠে কে দিবে শেষ বিজয়ের হাসি? দুরুদুরু বুকে কাজকর্ম গুছিয়ে অনলাইনে একটি লিঙ্ক থেকে ঢুকে চুপে চুপে দেখছিলাম খেলা। কোন উচ্ছ্বাসই দেখাচ্ছিলাম না। পাছে আউট হয়ে যায়।

আমার এক কলিগ আনন্দ করতে লাগলো। দৌড়ে এসে জানালো আপা, বাংলার মেয়েরাতো জিতে যাচ্ছে। তাকে একপ্রকার বকাই দিলাম। বললাম, চুপ থাকেন। মুখ লেগে যাবে। আউট না হয়ে যায়। শেষ ১৮ বলে জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ছিল ২৩ রান। উইকেটে ফাহিমা খাতুন এবং রুমানা আহমেদ। ফাহিমা ৭ বলে ৯ করে আউট হয়ে ফিরে গেলো। বাংলাদেশের তখন দরকার ১৫ বলে ১৭ রান। একেবারে “নেইল বাইটিং মোমেন্ট” যাকে বলে তেমন অবস্থা।

ব্যাটসম্যান সানজিদা সঙ্গী হলেন রুমানার। সিঙ্গেল নিয়ে নিয়ে খেলতে থাকেন। সানজিদার টার্গেট যত বেশি সম্ভব রুমানাকে স্ট্রাইক দেয়া। রুমানা দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। শেষ দুই ওভারে জয়ের জন্য দরকার পড়ে ১২ রান।

১৯ ওভার চলছে। বোলিং এ আসেন দীপ্তি শর্মা। তিনি মাত্র ৩ রান দিয়ে যান। ৬ বলে ৯ রান দরকার। দুই দলেই তখন চরম উত্তেজনার মুহূর্ত। বল করতে আসেন ভারতীয় দলপতি হারমানপ্রীত। সানজিদা সিঙ্গেল নিয়ে স্ট্রাইক দেন রুমানাকে। রুমানা সজোরে চার হাঁকালেন। আমি এবং আমার মত গোটা বাংলাদেশ তখন উল্লাসে ফেটে উঠেছে। মাঠে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা। এক পর্যায়ে তিন বলে দরকার তিন। সানজিদা ভেবেছিলেন এক ছক্কায় খেলা মাত করে দিবেন। লক্ষ্য ঠিক থাকলেও ভাগ্য সহায় হয়নি। সানজিদা বাউন্ডারি লাইনে ধরা পড়েন।

ইশ!!! বাংলাদেশ পারবেতো? ভরসার জায়গাটি কেমন একটু হলেও ধাক্কা খেতে লাগলো। আহা!! এত কাছে এসেও কী কাপটা হাতছাড়া হয়ে যাবে? আবার অপেক্ষা করতে হবে আমাদের এশিয়ার সেরার তালিকায় উঠতে? ৭ নাম্বার কাপটাও কী ভারতেই যাবে? উদ্বিগ্ন মনে চোখ বন্ধ করে অন্য কাজে মন দিলাম। ভাবছি, নাহ!! এই টেনশন আর নেয়া যায় না। যা হবার হবে। অন্তত ভারতকে ঘাম ঝড়িয়ে হারবে আমাদের মেয়েরা। দুর্বলের মত আত্মসমর্পণতো আর করেনি। এই যখন স্বান্তনা খুঁজছিলাম তখন দুই বলে দরকার তিন। নতুন ব্যাটসম্যান আসেন জাহানারা আলম। স্ট্রাইকে রুমানা। পঞ্চম বলে এক রান নেয়ার পর বোকামির ফল পান রুমানা। আউট হয়ে গেলেন আমাদের আশার রুমানা। যাওয়ার আগে তিনি করে গেছেন মহামুল্যবান ২৩ টি রান! ফলাফল এসে ঠেকে একদম শেষ বলে।

মনে পড়ে যায় এই মালয়েশিয়াতেই ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি ফাইনালের কথা। ফাইনাল ম্যাচে বাংলাদেশ ও কেনিয়া খেলছিলো। ক্রিজে তখন শান্ত ও আকরাম খান। ১৬৬ রানের টার্গেটে ব্যাট করছিলো বাংলাদেশ। এই রেজাল্টের উপরে নির্ভর করছিলো বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলার মর্যাদা পাবে কি পাবে না। টানটান উত্তেজনার সেই ম্যাচে খেলা এসে ঠেকলো লাস্ট বলে। এক বলে এক রান। টেলিভিশনে দেখার উপায় ছিলো না সেই সময়ে। গোটা বাংলাদেশ দম বন্ধ করে রেডিওর সামনে। শান্তর ব্যাট ধরে নেমে এলো সেই ঐতিহাসিক জয়ের মালা।

আজ যেন আবারো সেই ক্ষণের দেখা মিললো। শেষ বল। ড্র হবে না জয়? এক হলে ড্র, দুই হলে জয়! ব্যাট হাতে তৈরি সোনার মেয়ে জাহানারা। শান্তি পাচ্ছিলাম অন্তত হারছি না। ড্র হলেও চলবে। কিন্তু এ কী করলেন জাহানারা !! দুই নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন তিনি।

অধিনায়ক সালমাকে আর রানের খাতা খোলার সুযোগ দেয় নি জাহানারা। একাই তুলে নিলেন দায়িত্ব। জয় নিশ্চিত করেই দৌড়। ঠিক যেমন দৌড় দিয়েছিলেন শান্ত ব্যাট উঁচিয়ে। সে এক দৃশ্য। বুকের ভিতর থেকে ভালোবাসার ঢেউ উঠে এলো মেয়েদের জন্য। এইতো আমাদের বাংলাদেশ। এইতো আমাদের বাংলাদেশের মেয়েরা। শত অবহেলাতেও যারা হার মানে না। দমে যায় না। দুর্বল বলে অবহেলার টাইটেলকে জবাব দেয় ব্যাট হাতে।

এই জয় যেন আমাদের সবার অবহেলার এক মোক্ষম জবাব। এই জয় বলে দিচ্ছে নারী বলে অবহেলার দিন আর নেই। এখন দেশের সম্মান রক্ষায় নারীরাও সমান ভূমিকা রাখছে।

এশিয়া কাপ জয়ের মত একটি বিরল সম্মান এখন মেয়েদের হাত ধরেই এসেছে। কোন পুরুষের দল আনে নি। নারীদেরকে পিছিয়ে ফেলতে চায় যারা তাদের মুখে চার ছয়ের সাইনবোর্ড পরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, যাবে আমাদের সোনার বাংলার সোনার মেয়েরা। লাভ ইউ টিম টাইগার্স। তোমরাই বাংলাদেশ, তোমরাই পারো বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে।