plastic

প্লাস্টিকজাত পণ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশ্বজুড়ে যখন নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে শুধু রাজধানীতেই প্রতিদিন দুই কোটি পলিথিন জমছে বলে দাবি করেছে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার ঢাকায় সংগঠনের কার্যালয়ে ‘প্লাস্টিক দূষণ : পরিবেশের জন্য হুমকি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এই পরিসংখ্যান দিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠনটি। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এই পলিথিনকে ঢাকার জলাবদ্ধতার জন্যও দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেছে পবা।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পবার সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুস সোবহান বলেন, “রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় ১২০০ কারখানায় নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরি হচ্ছে। এগুলোর বেশিরভাগই পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক।

“ঢাকায় প্রতিদিন দুই কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়, যেগুলো পলিথিন বর্জ্য। এ বর্জ্য সামান্য বৃষ্টিতে নগরে জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।”

সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে সোবহান জানান, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ৭৯ শতাংশ প্লাস্টিক বা পলিথিন বর্জ্য পানিতে মিশে জলজ প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

“বাংলাদেশে উৎপাদিত প্লাস্টিকের বোতল, বিভিন্ন সামগ্রী এবং পলিথিন ব্যাগের অধিকাংশই পুনর্ব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন না করে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে খাল, নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। জলজ প্রাণী তা গ্রহণ করছে।”

জলজ প্রাণীর মাধ্যমে এই প্লাস্টিক আবার মানুষের খাদ্যচক্রেও প্রবেশ করছে জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

নিষিদ্ধ হলেও আইনের ফাঁক গলে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন চলছেই, ব্যবহৃত পলিথিন বুড়িগঙ্গার জন্যও হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে (ফাইল ছবি) নিষিদ্ধ হলেও আইনের ফাঁক গলে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন চলছেই, ব্যবহৃত পলিথিন বুড়িগঙ্গার জন্যও হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে
পবার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১০ সালে প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। প্রতি বছর এই সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে পাঁচ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি এবং বড় শিল্প কারখানায় ১২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। দেশে এখন প্লাস্টিক পণ্যের জনপ্রতি ব্যবহার গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৫ কেজিতে।

তিন বছর আগে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেছিলেন, “কতগুলো কারখানায় পলিথিন ব্যাগ তৈরি হচ্ছে কেউই সেই তথ্য দিতে পারছে না। বিনিয়োগ বোর্ড ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছেও এর সঠিক তথ্য নেই।”

পবার আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা বাংলাদেশে প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহারে পরিবেশ সংরক্ষণে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন।

পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, ব্যবহার, বিপণন ও বাজারজাতকরণের উপর ২০০২ সালে নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘নিষ্ক্রিয়তায়’ সেই আইন কার্যকর করা যায়নি বলে অভিযোগ করেন অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা সোবহান।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি পুলিশ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলাকে দোষারোপ করে তিনি ’রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাবকেও’ প্লাস্টিক দূষণের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সাবেক পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এর আগে বলেছিলেন, সহজলভ্য বিকল্প তৈরি না হওয়ায় পলিথিনের উৎপাদন ও বিপণন পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সাবেক পরিবেশমন্ত্রীর সমালোচনা করে আবদুস সোবহান বলেন, “২০০২ সালে নিষেধাজ্ঞা আসার পরে বাজারে বিকল্পও চলে এসেছিল। পাটজাত ব্যাগ উৎপাদনে গ্রামীণ কর্মসংস্থানও বেড়েছিল। কিন্তু আইন প্রয়োগে শিথিলতা আসতে পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন বেড়ে গেল।”

পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধের আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবিতে পবার মানববন্ধন (ফাইল ছবি)
প্লাস্টিক বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়ায় (রিসাইকেল) প্রযুক্তি ব্যবহারে পরিবেশ মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের সদিচ্ছা নেই বলেও মনে করেন তিনি।

সভায় বন্ড লাইসেন্সের মাধ্যমে আমদানিকৃত পলি প্রোপাইলিন পলিথিন শপিং ব্যাগ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করার পরামর্শ দেন বক্তারা। টিস্যু ব্যাগ আমদানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও জানান তারা।

সভায় আলোচক হিসেবে যোগ দেন স্পারসোর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল কাদির, পবার সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল, সম্পাদক শাহিন আহম্মেদ।

প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও উদ্যোগ

প্লাস্টিকের ব্যবহার ও উৎপাদন কমিয়ে আনাসহ নিষিদ্ধ করা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেওয়া পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিয়ে ‘আসুন প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করি’ প্রতিপাদ্যে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।

২০১৭ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একটি গবেষণার প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় বলেছিলেন, প্রতি বছর ৮ মিলিয়ন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে পড়ছে। এতে ৮ বিলিয়ন ডলারের সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্লাস্টিক ব্যাগ ও প্লাস্টিকজাত পণ্যকে সমুদ্র ও সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য কেবল হুমকিই নয়, প্রতিবছর হাজারো সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর কারণ বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আগামী ৯ জুন কুইবেকে অনুষ্ঠেয় জি-সেভেন আউটরিচ বৈঠকের মূল প্রতিপাদ্য হবে সমুদ্রকে দূষণ থেকে রক্ষা করা এবং উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের প্রতিকূলতা মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধি।

এতে সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ, অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা বন্ধের মত চ্যালেঞ্জগুলোর উপরেও ওই বৈঠকে আলোকপাত করা হবে বলে কানাডা সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

শনিবার অটোয়ায় এক ঘোষণায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেন, “প্লাস্টিক দূষণ বেড়ে যাওয়া, আবহাওয়া বিরূপ হয়ে ওঠা এবং অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণের কারণে আমাদের সমুদ্র ও উপকূল বিরাট ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।”

প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের দূষণ কমিয়ে আনতে ৫০টি দেশ পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

এতে বলা হয়, অনেক উন্নয়নশীল দেশেই প্লাস্টিকের ব্যাগ নর্দমা আটকে দিয়ে বন্যার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বেশ কয়েকটি দেশে প্লাস্টিক বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকলেও সেসব বিধিনিষেধ কার্যকর করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এমন উদ্বেগও জানিয়েছে জাতিসংঘ।