stock

ধারাবাহিক দরপতন আর লেনদেনের খরায় অনেকটাই নিষ্প্রাণ দেশের শেয়ারবাজার। সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য দেয়া বিশেষ সুবিধা এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের দুই প্রতিষ্ঠান শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জকে পাওয়ার মতো সুখবরও বাজারে প্রাণ ফিরছে না।

ক্রমাগত শেয়ারের দরপতনে একটু একটু করে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি কমে আসছে। পুঁজি হারানোর শঙ্কার পাশাপাশি আস্থার সংকট জেঁকে বসেছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। ফলে হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে দেশের শেয়ারবাজারে। কী কারণে শেয়ারবাজারের এমন চিত্র- তা নিয়ে জাগো নিউজের পাঁচ পর্বের প্রতিবেদনের আজ থাকছে চতুর্থটি।

দেশের শেয়ারবাজরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আসার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। যে কোম্পানিগুলো আসছে তাদের মান নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে তালিকাভুক্তির পর লেনদেনের শুরুতে শেয়ারের যে দাম উঠছে, পরবর্তীতে তা ধরে রাখতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে মূল্যসূচকে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৭ সালে আইপিও আসে মাত্র সাতটি। গত নয় বছরের মধ্যে এক বছরে এত কম আইপিও আর কখনও আসেনি। শুধু তাই নয়, শেষ চার বছরে আইপিও আসার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০১৪ সালে আইপিও আসে ২০টি। ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১২টিতে এবং ২০১৬ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ১১টিতে।

এদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে শেষ তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে আইপিও আসার পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৫ সালে ভারতের শেয়ারবাজারে আইপিও আসে ২১টি। এক বছরের ব্যবধানে ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ৮৩টি। ২০১৭ সালে আইপিও আসে ১৫৩টি।

বাজার বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি শক্তিশালী শেয়ারবাজার গড়ে তোলার মূল উপায় হলো তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো। এর সংখ্যা যত বাড়বে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ততই বিকেন্দ্রীভূত হবে। ভালো কোম্পানি যাতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় সে জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) উদ্যোগ নিতে হবে।

বিএসইর বিধান অনুযায়ী, কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা অতিক্রম করলেই ওই কোম্পানিকে পরবর্তী এক বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কোনো কোম্পানি ৫০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর তিন বছরের মধ্যে তালিকাভুক্তির বিধান রয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা আরোপের পর এক যুগ পার হলেও বেশিরভাগ কোম্পানিই তা মানছে না। তবে সরকারের নির্দেশনায় বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিকে এ শর্ত থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজের (আরজেএসসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা দেড় লাখ। এর মধ্যে ৫০ কোটি টাকার বেশি মূলধনের কোম্পানির সংখ্যা প্রায় এক হাজার। অথচ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা মাত্র ৩০২টি।

গত তিন বছরে যে কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে তার কোনোটিই প্রথমদিন যে দামে লেনদেন হয়েছে, পরবর্তীতে তা ধরে রাখতে পারেনি। এমনকি কিছু কিছু কোম্পানি আইপিওতে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছে, শেয়ারের দাম তারও নিচে নেমে গেছে।

বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে এন গ্রুপে (নতুন তালিকাভুক্ত) রয়েছে অ্যাডভেন্ট ফার্মা, ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং ও কুইন সাউথ টেক্সটাইল। এর মধ্যে ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিংয়ের মাত্র দুই কার্যদিবস লেনদেন হয়েছে। বাকি দুটি কোম্পানির মধ্যে অ্যাডভেন্ট ফার্মার শেয়ার গত ১২ এপ্রিল লেনদেনের প্রথমদিন শেষে দাঁড়ায় ৪৮ টাকা ৪ পয়সা। এক মাসের ব্যবধানে তা কমে ৪১ টাকা ৯০ পয়সায় দাঁড়ায়। অবশ্য মাঝে কোম্পানিটির শেয়ার দাম ৩৫ টাকা পর্যন্ত নেমে যায়।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বর্তমানে শেয়ারবাজারে যে টানা দরপতন দেখা দিয়েছে তার যুক্তিসংগত কোনো কারণ নেই। তারপরও পেছনে যে কয়টি কারণ আছে, এর মধ্যে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা কম থাকা অন্যতম কারণ। বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে বিএসইসির উচিত ভালো কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নেগোসিয়েশন করে শেয়ারবাজারে আনার পদক্ষেপ নেয়া। বড় কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসলে বাজারের গভীরতা বাড়বে।’

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, ‘আইপিওতে আসা কোম্পানিগুলো প্রথমদিকে যে দামে লেনদেন করে, পরবর্তীতে সেই দাম ধরে রাখতে পারে না। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শেয়ারবাজারে। যেমন একটি কোম্পানির শেয়ার শুরুতে ৫০-৬০ টাকায় লেনদেনের পর এর দাম যদি ৩০ টাকায় নেমে আসে, সেটা অবশ্যই সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বর্তমান বাজারেও এর একটি প্রভাব রয়েছে। তবে এখন যে টানা দরপতন, এজন্য তারল্য সংকটই বড় কারণ।’

ডিএসইর সাবেক পরিচালক খুজিস্তা নূর-ই-নাহরিন বলেন, ‘আইপিওতে অনেক আজেবাজে কোম্পানির শেয়ার আসছে। যেগুলো দাম ধরে রাখতে পারছে না। তারা শেয়ারবাজারে এসে কয়েকগুণ টাকা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ফতুর করে দিয়ে যাচ্ছে। বাজারে ভালো মানের শেয়ার আসছে না। শেয়ারবাজারের টানা পতনের পেছনে এটি একটি বড় কারণ।’