dhan

বগুড়া জেলার ধুনট থানার চরপাড়া গ্রামের কৃষক আকিমুদ্দিন শেখ। গেল বছর দাম ভালো পাওয়ায় এবার ১২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন। কিন্তু বর্তমান বাজারে যে দর তাতে ধান বিক্রি করে লাভের মুখ দেখা হবে না- এমন দুশ্চিন্তায় সময় পার হচ্ছে তার। বলেন, ‘কামলার দাম চড়া (উচ্চমূল্য), লাভের সবটাই যেন তাদের দিতে হচ্ছে। বর্তমানে এক মণ ধান বিক্রি করে একজন কামলার (শ্রমিক) মজুরি দিতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে কৃষক তো একসময় সর্বশান্ত হয়ে পড়বে।’ শুধু বগুড়ার আকিমুদ্দিনের নয়, সারাদেশের কৃষকের যেন একই অবস্থা। মৌসুমি কামলার তীব্র সংকট যেন সর্বত্র। দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজ’র। তারা জানান, সব জেলায় ধানকাটা ও মাড়াইয়ের জন্য দিনমজুরের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া মজুরি বেশি হওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। শেরপুর জেলার ব্যস্ততম শহর খোয়ারপাড় মোড়। গেল রোববার সকাল সাড়ে ৬টায় ‘দিনহাজিরা’ শ্রমিকের খোঁজে সেখানে উপস্থিত হন শতাধিক কৃষক। তাদের একজন আসাদুজ্জামান লায়ন। আলাপকালে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘কৃষি কাজ করে এখন লাভ করা কঠিন। কামলার (শ্রমিক) দাম এত হয়েছে যে, খরচ পোষায় না।’
‘একজন কামলার জন্য এখন দিনহাজিরা দিতে হয় ৫০০ টাকা। বেশি কাড়াকাড়ি (চাহিদা) থাকলে তা ৬০০ টাকায় ঠেকে। এর বাইরে দু-বেলা খাবার দিতে হয়। খাবারের পেছনে আরও ১০০ টাকা খরচ। অথচ বাজারে বর্তমানে এক মণ ধানের দাম ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। এভাবে চলতে থাকলে চাষাবাদ বাদ দেয়া ছাড়া পথ থাকবে না।’

একই কথা জানালেন কৃষক আরিফও। বলেন, ‘নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করি। কিন্তু একা একা তো সব কাজ শেষ করা যায় না। এজন্য একজন কামলার খোঁজে এসেছি। কিন্তু যে দাম হাকা হচ্ছে তাতে তো পরবর্তীতে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকাই দায় হবে যাবে।’

‘শেরপুরে ধানের দাম এখন ৬০০ থেকে ৬২০ টাকা। শুকনা ধানের দাম সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা। এ অবস্থায় এক মণ ধান বেচে একজন দিনমজুরের মজুরি দিতে হচ্ছে।’

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ইরি ধান কাটার মৌসুম চলছে জোরেসোরে। দিন যত যাচ্ছে কৃষি মজুরির দামও বাড়ছে। বর্তমানে একজন দিনমজুরের দাম হাকা হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। স্থানীয় হাটগুলোতে নতুন ধান মণপ্রতি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে।

জেলার কৃষকরা জানান, দিন সাতেক আগে একজন মজুরের মজুরি ছিল সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। এখন সব মাঠেই পুরোদমে ধান কাটা শুরু হয়েছে। মজুরদের চাহিদাও বেড়েছে, মজুরিও চাওয়া হচ্ছে তাদের ইচ্ছা মতো। ফলে ধানের লাভ যেন তাদের পেছনেই ব্যয় করতে হচ্ছে।

নাগরৌহা গ্রামের কৃষক করিম মিয়া জানান, আগাম আবাদ করে শুভলতা জাতের ধান কাটা শুরু করেছেন। হাজিরা হিসেবে প্রতি মজুরকে দিনে ৫৫০ টাকা দিতে হচ্ছে। মৌসুমের প্রথমে ধান কাটায় আশানুরূপ ফলনও পাচ্ছেন। কিন্তু শঙ্কাও দেখা যাচ্ছে তার মনে।

বলেন, ‘যেভাবে দিনমজুরের মজুরি গোনা লাগছে তাতে লাভের মুখ হয়তো দেখা হবে না। মজুরের পেটেই যাবে ধানের লাভ!’

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, এ বছর ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার হেক্টর জমি। আবাদ হয়েছে ২২ হাজার ৭২৫ হেক্টর। ফলনও ভালো হয়েছে। দামও ভালো। ধান কাটার শেষ সময় পর্যন্ত প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে কৃষক নিশ্চিত লভবান হবেন।

জাগো নিউজের রংপুর সংবাদদাতা জানান, রংপুরে প্রতি মণ নতুন ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৪০ টাকায়। এ অঞ্চলে একজন কামলার (শ্রমিক) দাম প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৬৫০টাকা। অনেকে চুক্তিতে কামলা নিয়ে ধান কাটছেন। সে হিসেবে প্রতি বিঘা জমিতে ধান কাটতে তারা নিচ্ছেন ৩০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা।

রংপুরের কৃষক আলী হাসান জানান, ধানচাষে যে খরচ আর মৌসুমের সময় কামলার যে দাম তাতে লাভের মুখ দেখা সম্ভব নয়।

দিনাজপুরের সংবাদদাতা জানান, জেলায় ৭৭ কেজি বস্তার ২৮ ধান বিক্রি হচ্ছে ১৩১৫ থেকে ১৩২০ টাকায়। একই ওজনের মিনিকেটের বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৫৫০ টাকায়। সে হিসেবে এখানে এক মণ ২৮ ধানের দাম পড়ছে ৬৮৫ টাকা, এক মণ মিনিকেট ধানের দাম পড়ছে ৮০৫টাকা। সে ক্ষেত্রে প্রতি একর জমিতে অর্থাৎ ১০০ শতক জমিতে ধান কাটতে ও মাড়াই করতে শ্রমিক বাবদ খরচ পড়ছে নয় হাজার ২০০ টাকা।
দিনাজপুরে দিনহাজিরা কামলার দাম ৫০০ টাকা। জেলায় এখনও পুরোদমে ধানকাটা শুরু হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা খাতুন বলেন, ‘শিল্পায়নের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এজন্য কৃষি থেকে শিল্পের দিকে যাচ্ছে শ্রমশক্তি। এটা দেশের জন্য ভালো নাকি মন্দ সেটা নির্ভর করবে সার্বিক ম্যানেজমেন্টর ওপর। কেননা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে কৃষিতে মনোযোগ বাড়াতে হবে। এজন্য শ্রমিক একটা বড় ফ্যাক্টর।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংকট আছে। হয়তো আরও বাড়বে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আধুনিক যন্ত্রপাতির দিকে ঝুঁকতে হবে। কৃষককে প্রশিক্ষিত করতে হবে। এছাড়া বাজেটে কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর বরাদ্দও বাড়াতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘কৃষকের পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিতের ক্ষেত্রে সরকারের আরও বেশি দায়িত্ব নেয়া উচিত। এজন্য সরকারের দৃষ্টি রয়েছে। সার, বীজ ও বিদ্যুতে সহায়তা দেয়া হচ্ছে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘ফসলের প্রাথমিক মূল্য ও ভোক্তাপর্যায়ের মূল্যের মধ্যবর্তী ব্যবধান অনেক বেশি। ব্যবসায়ীদের অনেকে অতি মুনাফা করছেন। এটা অনুচিত। কৃষক ও ব্যবসায়ী দুপক্ষের জন্য ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরিতে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করি।’

কৃষিশ্রমিকের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কৃষিশ্রমিক সংকট কাটাতে উদ্যোগ নেয়া হবে। উন্নত বিশ্বে এ সমস্যার মোকাবেলা যেভাবে করা হয় আমরাও সে দিকে যাব। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এজন্য সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।’