পৃথিবীর ইতিহাসে সংঘটিত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্প বিপ্লবে আমাদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। এর যথেষ্ট কারণও ছিল। তখন আমরা ছিলাম ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের অধীনে শাসিত একটি পরাধীন জাতি। এখন দিন বদলেছে। আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ— লালসবুজের পতাকার স্বাধীন সত্তা। এই সত্তাকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা করেই স্বনির্ভর হওয়ার পথে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমান পৃথিবীতে শিল্প বিপ্লব ঘটেছে তথ্যপ্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে— যাকে আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করছি। এই বিপ্লবের সফল অংশীদারিত্বের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা আমাদের রয়েছে। আমাদেরই আছে সর্বাধিক তরুণ জনশক্তি যাদেরকে আমরা উপযুক্ত কাজ দিতে পারছি না। ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে বৃহত্ জায়গা নিয়ে শিল্পকারখানা তৈরির সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ আমাদের রয়েছে স্বল্প পরিসরে অধিক জনসংখ্যা। এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজ দেওয়া যেমন আমাদের দায়িত্ব, তেমনি সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে অধিক জনবলের কর্মসংস্থান করাও আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই কঠিন কাজটি সম্ভব তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক প্রশিক্ষণ এবং ব্যবহারের মাধ্যমে।

যুগে যুগে বিজ্ঞানের যে আবিষ্কার তার মূলে রয়েছে মানুষের স্বপ্ন দেখার প্রবণতা এবং গাণিতিক জ্ঞানের পরিপক্কতা। জীবনের প্রতিটি ঘটনাকেই প্রকৃতপক্ষে গণিতের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। আর যে জাতি গণিতে যত পারদর্শী সে জাতি বিজ্ঞানে তত উন্নত। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দক্ষ জনবল তৈরির যে উদ্যোগ তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এর নতুন ভাষা বাজারে আসলেই যে আমরা তা শেখানোর জন্য বিভিন্ন কোর্স চালু করতে উদগ্রীব হয়ে পড়ি তা মোটেও প্রোগ্রামিং শিক্ষার ব্যাকরণ নয়। আমার মতে একজন দক্ষ প্রোগ্রামার নতুন কোনো প্রোগ্রামিং ভাষা আয়ত্ত করতে ১৫ দিনের বেশি সময় নেয় না। তাই আমাদের উচিত প্রোগ্রামিং শিক্ষাকে ভাষার গণ্ডিতে আবদ্ধ না করা। বরং ছাত্রছাত্রীদের প্রোগ্রামিং লজিক বৃদ্ধির সর্বাত্মক চেষ্টা করা।

২০১৬ সালের ডিপ্লোমা শিক্ষার কম্পিউটার টেকনোলজির সিলেবাস দেখে অবাক হলাম। বিষয়টিকে অনেকটা ১ থেকে ১০-এর নামতা না শিখিয়ে কাউকে ক্যালকুলেটরের মাধ্যমে গাণিতিক হিসাব করতে শেখানোর মতো। প্রোগ্রামিং শিক্ষার মূল নীতি হলো কোনো সমস্যার গাণিতিক সমাধান বের করা, তারপর সেই সমাধানকে কোনো একটি ভাষার মাধ্যমে লিখে প্রোগ্রাম আকারে স্বয়ংক্রিয় রূপ দেওয়া। পরিপক্ক গণিত জ্ঞানসম্পন্ন সিস্টেম প্রোগ্রামে পারদর্শী দেশগুলো পৃথিবীর ভাইরাস এবং অ্যান্টিভাইরাস প্রোগ্রামের পথিকৃত্ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তাই দেশের ডিপ্লোমা শিক্ষায় কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এর ভিত্তি জ্ঞান তৈরির জন্য কোনো সিস্টেম প্রোগ্রামিং ভাষা না রেখে সরাসরি অবজেক্ট অরিয়েনটেড প্রোগ্রামিং ভাষা পাইথন শেখানো যুক্তিযুক্ত কিনা তা আরো বহুবার ভেবে দেখা দরকার।

এবার আসছি দেশের পাঁচশ’ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের পাঠ্যবই সম্পর্কিত বিষয়ে। ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদেরকে পাঠ্যবই হিসেবে বাংলায় লেখা যে বই সরবরাহ করা হচ্ছে তার সাবলীলতা, পঠনমাধুর্য ও বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের গভীরতা ও নির্ভুলতা নিয়ে বিস্তর সমস্যা রয়েছে। আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করতে চাই তাহলে কারিগরি শিক্ষার বইগুলোর বাংলা অনুবাদ মানসম্মত হতে হবে। এইজন্য অনুবাদ দরকার যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। এই কর্তৃপক্ষ বলতে আমি বোঝাচ্ছি বিশ্বের নামকরা প্রকাশনা সংস্থাগুলোকে— যারা বিষয়ভিত্তিক মূল বইগুলো মুদ্রণ করে। এক্ষেত্রে ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, চীন, জাপান ইত্যাদি দেশের নিজ ভাষায় অনুবাদ সম্পর্কিত পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। চীন এবং উল্লেখিত দেশগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়েছে এর কারণ ব্যাখ্যা করতে ছোট একটি গাণিতিক তুলনা তুলে ধরলাম। ধরি, চীনের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি আর বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি। মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার কারণে চীনের ১৪০ কোটি লোকই তাদের মেধার প্রয়োগ ঘটাতে পারছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নে। সেখানে আমাদের উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান চর্চায় ইংরেজির প্রাধান্য থাকায় তাতে অংশগ্রহণ করতে পারছে হয়তো মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগ জনগোষ্ঠী শুধু ভালো ইংরেজি জানে। এর ফলে বহুল জনসংখ্যাসমৃদ্ধ দেশ হয়েও আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবদান রাখছে দেশের জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ। সুতরাং কোনো দেশের কারিগরি ও বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নয়নে ঐ দেশের জনগোষ্ঠীকে তার মাতৃভাষায় বিজ্ঞানের সমকালীন বইগুলো পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে। তবেই আমরা পাবো আমাদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন। প্রোগ্রামিং-এর জন্যে যেহেতু ডিসক্রেট এবং কনক্রিট ম্যাথমেটিক্স অপরিহার্য, সেক্ষেত্রে গণিতের এই শাখাগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের পারদর্শিতার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ ডোনাল্ড নুত অ্যালগ্যারিদম-এর উপর যে বই লিখেছেন তা দিয়েই বিশ্বের প্রায় সকল প্রোগ্রামিং সমস্যার গাণিতিক সমাধান সম্ভব। তার লেখা বইটির নাম—The Art of Computer Programming. বিল গেটস এই বইয়ের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে লিখেছেন, “আপনি যদি এই বইটির সমস্ত বিষয়বস্তু ভালোভাবে বুঝে থাকেন তাহলে আমাকে আপনার বায়োডাটা পাঠান কারণ নিঃসন্দেহে আপনি একজন ভালো প্রোগ্রামার”। প্রয়োজনে এই বইটির এক থেকে সাত খণ্ড প্রোগ্রামে আগ্রহী ছাত্রদের মধ্যে বাংলাভাষায় অনুবাদ করে সরবরাহ করা যেতে পারে। আমি এই বইয়ের ইংরেজি ভার্সন ছাড়াও অন্য ভাষায় লিখিত ভার্সন দেখেছি। এছাড়া অন্যান্য লেখকের অ্যালগ্যারিদম বিষয়ক বইও বাংলায় অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। চতুর্থত শিল্পবিপ্লবের অগ্রসৈনিক তৈরি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় সমগ্র যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে চাই সঠিক পরিকল্পনা। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং প্রকল্পে অর্থলগ্নি জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে বিস্তর জিজ্ঞাসা থেকেই যায়।