mushfiqur-rahim-

নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, একাগ্রতা, অধ্যবসায় আর ভাল করার অদম্য ইচ্ছা থাকলে যে শত প্রতিকুলতাও অতিক্রম করা যায়, অনেক সীমাবদ্ধতাকেও জয় করা সম্ভব- মুশফিকুর রহীম তার জ্বলন্ত উদাহরন।

একজন প্রথাগত ও ব্যাকরণসম্মত ব্যাটসম্যানও যে দীর্ঘ এক যুগে ৬০টির বেশি ম্যাচ খেলে নিজের ব্যাটিং স্টাইল ও খেলার ধরণ পাল্টে চরম আক্রমণাত্মক হতে পারেন, ওভার পিছু ১০ থেকে ১২ রান তুলে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিতে পারেন- শনিবার কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে মুশফিকুর রহীম তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।
একজন ভাল ব্যাটসম্যানের তকমা গায়ে থাকলেও এতকাল দেশে ও ক্রিকেট বিশ্বে মুশফিকুর রহীমের পরিচিতি আসলে একজন পরিপাটি ব্যাটিং শৈলির ব্যাকরণসম্মত উইলোবাজ হিসেবে।

সবাই তাকে চেনে, জানে একজন ব্যাকরণসম্মত ব্যাটসম্যান হিসেবে। যিনি ক্রিকেট ব্যাটিংয়ের মৌলিক তথা ব্যাকরণ মেনে প্রথাগত ব্যাটিং করে থাকেন। অর্থাৎ যার কাছে ব্যাটিং মানেই বলের মেধা ও গুণ বিচার করে খেলা। ব্যাটিং টেকনিক, টেম্পারামেন্ট, ধৈর্য্য আর একাগ্রতাকে মানদÐ ধরলে মুশফিকুর রহীম বাংলাদেশের এক নম্বর ব্যাটসম্যান।

ব্যাটিং শৈলি একদম ব্যাকরণসিদ্ধ। পরিপাটি। গুড লেন্থ বলকে মারা চলবে না। ভাল লেন্থ ডেলিভারি শট খেলার জন্য নয়। সমীহ দেখানোর জন্য। এই মন্ত্রে দীক্ষিত মুশফিকের ব্যাটিংয়ের প্রথম ও শেষ কথা সেটাই।

পাশাপাশি অফ স্ট্যাম্পের আশাপাশের বল ছেড়ে দেয়া, শর্ট অফ লেন্থ থেকে শরীর সোজা বিশেষ করে বুক, মুখ ও মাথা বরাবর আসা বল না খেলে যতটা সম্ভব শরীর ও ব্যাট সরিয়ে নেয়ার চেষ্টাই করেন। আলগা ডেলিভারি মানে হাফ ভলি, ওভার পিচ, শর্ট পিচ আর অফ স্ট্যাম্পের বাইরে খুব বেশি জায়গা পাওয়া বলগুলোই তার কাছে স্কোরিং ডেলিভারি হিসেবে চিহ্নিত।

মূলতঃ এ ধরনের বাজে বলগুলো থেকে রান করতেই মুখিয়ে থাকেন মুশফিক। সেই বলগুলোর বিপক্ষেই তার ব্যাট যেন বিদ্যুতের মত চমকায়। বাকি সময় শান্তই থাকে। চটকদার মার, ঝুঁকি নিয়ে ভাল বলে তেড়ে-ফুঁড়ে আক্রমণাত্মক বিগ হিট নেয়া থেকে যতটা সম্ভব বিরতই থাকেন।

উইকেটে গিয়ে দুম করে এক-দুই পা বেরিয়ে সোজা লং অফ, লং অন আর ডিপ মিড উইকেটের ওপর দিয়ে চার-ছক্কা হাঁকানোর প্রবনতাই কম তার মধ্যে। এই উচ্চাভিলাসি শট কম খেলা এবং বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে বিগ হিটে কম যাবার কারণেই ক্যারিয়ারের প্রথম থেকে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে খানিক পিছিয়ে ছিলেন মুশফিক।

২০ ওভারের ম্যাচ মানে ১২০ বলের খেলা। টেস্টের সাথে তুলনা করা বাতুলতা। ৫০ ওভারের একদিনের ম্যাচের সাথেও যার আকার-আয়তন, গতি প্রকৃতি, মেজাজ ও ধরনের কোনই মিল নেই। এখানে চটকদার মার, চার-ছক্কার ফুলঝুড়ি আর বাহারি ও চটকদার স্ট্রোক প্লে‘ই শেষ কথা।

মুশফিকুর রহীম ক্যারিয়ারের বড় সময় সেই কাজটিই খুব ভালভাবে করতে পারেননি। পারেননি বলেই টেস্ট এবং ওয়ানডের তুলনায় তার টি-টোয়েন্টি পরিসংখ্যান দূর্বল ও জীর্ন। ১২০ বলের ম্যাচ। একজন ব্যাটসম্যান এর অর্ধেক না হয় তিন বা চার ভাগের এক ডেলিভারিতে অন্তত ১২০/১৩০ কিংবা তার বেশি স্ট্রাইক রেটে রান করতে না পারলে স্কোরবোর্ড চাঙ্গা ও মোটা তাজা হওয়া কঠিন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ক্যারিয়ারের বড় সময় সে কাজটিই তেমন দক্ষনতার সাথে সম্পাদন করতে পারেননি মুশফিক। টেস্ট আর ওয়ানডেতে যিনি রান তোলা, শতরান, হাফ সেঞ্চুরি ও ব্যাটিং গড়ে তামিম ও সাকিবের প্রায় কাছাকাছি, সেই মুশফিক টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের বড় সময় অনেক পিছনে পড়েছিলেন।

ছোট্ট পরিসংখ্যানেই তা পরিষ্কার হবে। আসুন তা দেখে নিই। যে ম্যাচ দিয়ে শুরু বাংলাদেশে টি-টোয়েন্টি যাত্রা, তাতে ছিলেন মুশফিক। ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে লাল সবুজ জার্সি গায়ে প্রথম মাঠে নামা মুশফিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঘরের মাঠে দুই ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের আগে পর্যন্ত ছিলেন ব্যর্থ পারফরমারের তালিকায়।

লঙ্কানদের সাথে ১৫ ও ১৮ ফেব্রæয়ারি দুই ম্যাচের সিরিজে ব্যাট হাতে মাঠে নামার আগে ৬১ ম্যাচে তার ফিফটি ছিল মাত্র একটি। তাও পাঁচ বছর আগে (২০১৩ সালে ঢাকায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে)। ওটা ছিল তার ৩০ নম্বর ম্যাচ। যাতে চার নম্বওে নেমে সাত চার ও এক ছক্কায় ২৯ বলে ৫০ রানের ইনিংস উপহার দিয়েছিলেন।

এরপর টানা ৩২ ম্যাচ পঞ্চাশশূন্য। এ দীর্ঘ সময় একবারই ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলা সম্ভব হয়েছিল (২০১১-র অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে; ছয় নম্বরে নেমে ২৬ বলে অপরাজিত ৪১ রান)। রুদ্ধশ্বাস প্রতিদ্ব›িদ্বতায় বাংলাদেশ জয়ী হয় খেলার মাত্র এক বল বাকি থাকতে। এর মধ্যে ২৩ বার দু অংকে পৌছানোর আগেই বিদায় নিয়েছেন। আর ১০ পেড়–লেও ২০ ‘র মধ্যে আউট হয়েছেন আরও ১৭ বার। মানে ৪০ বার তার ২০‘এর বেশি করা সম্ভব হয়নি।

সাবেক কোচ হাথুরুসিংহে এমন দুর্বল, জীর্ন-শীর্ণ পরিসংখ্যান দেখেই টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে মুশফিকুর রহীমকে সরানোর কথা ভাবছিলেন। কে জানে হাথুরু এতদিন থাকলে হয়ত মুশফিক এই নিদাহাস ট্রফির দলে জায়গা নাও পেতে পারতেন!

সে যাই হোক, হাতুরাসিংহে চলে যাওয়ার পর সম্বিৎ ফিরে পেলেন মুশফিক। ভিতরে নিজেকে মেলে ধরার অন্যরকম তাগিদ মুশফিকের। মনে মনে হয়তো ভাবছিলেন, ‘পরিসংখ্যাান খারাপ বলে আমাকে টি টোয়েন্টি থেকে বাদ দেয়ার চিন্তা ভাবনা করেছিলেন, দাঁড়ান আপনাকে একটা উচিৎ জবাব দেই! আপনার নতুন দলের বিপক্ষেই আমি নিজেকে বদলে ফেলবো। এখন থেকে প্রথাগত গানিতিক ও ব্যাকরণসিদ্ধ ব্যাটিং বাদ দিয়ে আমি টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে হাত খুলে খেলবো।’ যেমন ভাবা তেমন কাজ।

১৫ ফেব্রæয়ারি ক্যারিয়ারের ৬২ নম্বর ম্যাচটিই ছিল চন্ডিকা হাথুরুসিংহের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বদলে যাওয়া মুশফিকের প্রথম ম্যাচ। শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে দিবা রাত্রির ম্যাচে দল হারলেও বুক চিতিয়ে লড়লেন মুশফিক। সেই পাঁচ বছর আগে ক্যারিয়ারের ৩০ নম্বর ম্যাচে (তিনবার ব্যাটিং পাননি, ২৭ নম্বর ইনিংসে) প্রথম ফিফটি হাঁকানোর ৩২ ম্যাচ পর (পাঁচবার ব্যাটিং পাননি, মোট ২৭ ইনিংস) আবার পঞ্চাশে পৌছে গেলেন তিনি। তাও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নয়। ঝড়ের গতিতে।

৪৪ বলে দেড়শো স্ট্রাইকরেটে ৭ বাউন্ডারি আর ১ ছক্কায় ৬৬ রানের ইনিংসটির ওপর ভর করেই টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে নিজেদের সর্বাধিক ১৯৩ রানের রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ; কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। এত রান করেও ৬ উইকেটে হারতে হয়েছে।

মাঝে সিলেটে তিন বলে ছয় আর এবার কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে নিদাহাস ট্রফির প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে ১২৮.৫৭ স্ট্রাইকরেটে ১৪ বলে ১৮ রানে আউট হলেও কাল একই মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেললেন ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস।

শুধু আগের ৬৬ রান টপকে নিজের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ রান উপহার দেয়াই শেষ কথা নয়, সম্ভবত টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশের এ যাবৎকালের সেরা ম্যাচ জেতানো ব্যাটিং নৈপুণ্যই দেখিয়েছেন মুশফিক।

দুই ওপেনার লিটন দাস (১৯ বলে ৪৩) আর তামিম ইকবালের (২৯ বলে ৪৭) সাহসী ও উত্তাল ব্যাটিং এবং প্রথম উইকেটে মাত্র ৬ ওভারে ৭৪ রান ওঠার পরও এক পর্যায়ে খেলার নিয়ন্ত্রন প্রায় বেরিয়ে যাবার উপক্রম ঘটেছিল। সেই অবস্থায় শক্ত হাতে হাল ধরেন মুশফিক।

৩৫ বলে পাঁচ বাউন্ডারি ও চার ছক্কায় ২০৫.৭১ স্ট্রাইকরেটে ৭২ রানের হার না মানা ইনিংস খেলে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে সাহসী নাবিকের মত বীরের বেশে সাজঘরে ফেরেন মুশফিক। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে যে দল আগে কোনদিন ১৬৬ রানের বেশি টপকে জয় পায়নি, সেই দল শনিবার কলম্বোয় ২১৪ রান অতিক্রম করে জিতলো ৫ উইকেটে।

টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে রান তাড়া করে জেতায় এটা চতুর্থ সেরা। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রান তাড়া করে জয়ের ম্যাচ। এমন রেকর্ডের ম্যাচে দু’শোর ওপরে স্ট্রাইকরেটে ব্যাট করে হিরো মুশফিক।

প্রয়োজনে নিজের চিরায়ত ধারা ও ছন্দ পাল্টে হাত খুলে খেলা যায় এবং সে জন্য আহামরি কোন কিছুর প্রয়োজন পড়ে না। শুধু একাগ্রতা, ইচ্ছে, আন্তরিক চেষ্টা থাকলেই যে ব্যাকরণসম্মত ব্যাটিং ছেড়ে চার ও ছক্কার ফুলঝুড়ি ছোটানো যায়, দলের প্রয়োজনে ওভার পিছু ১১-১২ এমনকি তার বেশি রানও অবলীলায় তুলে নেয়া সম্ভব- সেটাই করে দেখালেন মুশফিক।

শনিবার লঙ্কান পেসার থিসারা পেরেরার করা ম্যাচের শেষ ওভারের প্রথম চার বলে ৯ রান তুলে (প্রথমে ডাবলস, পরের বলে বাউন্ডারি আর তিন নম্বর ডেলিভারিতে আবার ডাবলস ও চতুর্থ বলে সিঙ্গেলস) জয়ের বন্দরে পৌছানোর পর ‘নাগিন নৃত্য’ সহ নানা রকম অঙ্গ-ভঙ্গি ও বিপুল উল্লাস- উচ্ছাস সহ জয়োৎসবে মেতে মুশফিক আসলে জানান দিলেন, ‘আমি পেরেছি। আমি পারি। ক্রিকেটীয় ব্যাকরণ মেনেই শুধু নয়, দলের প্রয়োজনে আমি বিধ্বংসী ব্যাটিংও করতে পারি। মাথা নিচু করে কভার ড্রাইভ, অফ-অন ড্রাইভ আর ফ্লিক-স্কোয়ার কাটই শুধু নয়, ওভার পিছু ১২-১৩ রান করতে আমি দুম করে যাকে তাকে অবলীলায় ছক্কাও হাকাতে জানি।’