ভবিষ্যতের মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ে মানুষজন কী ভাবছে, তা জানা অর্থনীতির নীতিনির্ধারকদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির হার বর্তমানের চেয়ে বাড়বে, নাকি কমবে- তা নিয়ে সমাজের নানা পেশার লোকজনের ভাবনাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘মূল্যস্ম্ফীতির প্রত্যাশা’ বলা হয়ে থাকে। বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ে মানুষের ভাবনা জানতে চায়। বাংলাদেশ ব্যাংকও সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি জরিপ করেছে। এতে দেখা গেছে, বেশিরভাগ মানুষ মনে করছে আগামী এক বছর নাগাদ মূল্যস্ম্ফীতি এখনকার চেয়ে বাড়বে।

নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে গত মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক এ জরিপ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ ৭টি শাখা অফিস জরিপের জন্য বিভিন্ন পেশার এক হাজারেরও বেশি মানুষের মতামত নিয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া অন্তত ৭৫ শতাংশ বলেছেন, এক বছর পর মূল্যস্ম্ফীতি ৬ শতাংশের বেশি হবে। এ কারণে সরকার চলতি অর্থবছরে বার্ষিক মূল্যস্ম্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশে সীমিত রাখার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক এবারের মুদ্রানীতিতে (জানুয়ারি-জুন) ৬ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যস্ম্ফীতি হতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে। সর্বশেষ হিসাবে ডিসেম্বরে দেশে গড় মূল্যস্ম্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, ২৫ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা মনে করছেন, এক বছর পর গড় মূল্যস্ম্ফীতি হবে ৬ থেকে ৭ শতাংশ। প্রায় ২৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, মূল্যস্ম্ফীতি হবে ৭ থেকে ৮ শতাংশ। অন্তত ১৫ শতাংশ উত্তরদাতা ৮ থেকে ৯ শতাংশ মূল্যস্ম্ফীতির প্রত্যাশা করছেন। ৫ শতাংশের কম মূল্যস্ম্ফীতির প্রত্যাশা মাত্র ৫ শতাংশ উত্তরদাতার।

মানুষ কেন মনে করছে মূল্যস্ম্ফীতি বাড়বে- এ প্রশ্নের উত্তরে জরিপের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, পরপর দুটি বন্যার পর চালের দাম বেড়ে গেছে। আবার সামনে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নগদ অর্থের সরবরাহ বাড়তে পারে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। উত্তর দেওয়ার সময় মানুষ এসব বিষয় বিবেচনা করেছে বেশি। বাংলাদেশে মূল্যস্ম্ফীতির যে হিসাব করা হয়, তাতে চালের দাম খুব প্রভাব বিস্তার করে। ভোক্তা মূল্যসূচকে ( সিপিআই) চালের অংশ প্রায় ২০ শতাংশ। আর চালের দাম গত এক বছরে বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ম্ফীতি বৃদ্ধির প্রত্যাশাটা স্বাভাবিক। সমকালকে তিনি বলেন, খাদ্য মূল্যস্ম্ফীতি বৃদ্ধির প্রবণতা থেকে বিশেষত চালের দামের কারণে মানুষের এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে। মানুষ লক্ষ্য করছে, কোনো কিছুর দাম বাড়লে সাধারণত কমে না। আবার খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ম্ফীতি অনেক কম থাকার যে তথ্য পরিসংখ্যান ব্যুরো দিচ্ছে, তা অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে গেল ডিসেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে খাদ্য মূল্যস্ম্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। এর আগের বছরের ডিসেম্বরে যা ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ ছিল। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ম্ফীতি (বাড়িভাড়া, পরিবহন, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ নানা সেবা) এক বছর আগের ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ম্ফীতি বলতে আগের বছরের একই মাসের চেয়ে মূল্যসূচক যতটুকু বাড়ে তার শতকরা হারকে বোঝায়।

মানুষের প্রত্যাশা কী মূল্যস্ম্ফীতি বাড়ায়- এমন প্রশ্নের উত্তরে সায়মা হক বিদিশা বলেন, বেশিরভাগ মানুষ প্রত্যাশা করলে তা অনেক সময় মূল্যস্ম্ফীতি বাড়াতে পারে। আর মানুষ প্রত্যাশা করে বর্তমান প্রবণতা দেখে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো পণ্যের প্রকৃত চাহিদা যতটুকু, মানুষের প্রত্যাশা তার চেয়ে বেশি চাহিদার সৃষ্টি করে। যেমন- রোজার সময় বেগুণের দাম বাড়বে- এটা অনেকেই মনে করেন। এই মনে করাটা দাম বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ ব্যাংক তার মুদ্রানীতিতে বলেছে, খাদ্য মূল্যস্ম্ফীতি বৃদ্ধির প্রভাব হিসেবে আগামী খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ম্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ এবং এ বছরও বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। বাংলাদেশ যে দুটি দেশ থেকে বেশিরভাগ পণ্য আমদানি করে সেই ভারত ও চীনের মূল্যস্ম্ফীতিতে ঊর্ধ্বগামী প্রবণতা রয়েছে। এসব বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক তার মুদ্রানীতিতে মুদ্রা ও ঋণপ্রবাহে সংযত থাকার কৌশল ঘোষণা করেছে।