brtc

রাজধানীর মিরপুর কাজীপাড়া থেকে বাসে উঠেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী এনামুল হক। নামবেন আগারগাঁওয়ে। কিন্তু ইতোমধ্যেই মতিঝিলগামী বাসটির হেলপার (ভাড়া আদায়কারী) সৈয়দ আলীর সঙ্গে এনামুল হকের বেধেছে বাগবিতণ্ডা।

আর এই বাগবিতণ্ডার বিষয় ভাড়া নৈরাজ্য। এনামুল হক বলছেন, কাজীপাড়া থেকে বাসে উঠে আমি নামব আগারগাঁও, যেখানে ভাড়া হওয়া উচিত সর্বোচ্চ সাত টাকা সেখানে আমার কাছে ভাড়া চাওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা।
অন্যদিকে বাসের হেলপার সৈয়দ আলী বললেন, আমাদের বাস সিটিং সার্ভিস। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের চেকার আছে। চেকাররা যখন যাত্রী গুনে ওয়ে বিলে স্বাক্ষর করে দেয় এরপর যাত্রী যেখানেই নামুক, তাকে পরবর্তী চেকার স্টপেজের ভাড়া দিতে হবে। এটাই সিটিংয়ের নিয়ম। বাসের হেলপার ও যাত্রীর মধ্যে বাগবিতণ্ডার এই চিত্র নিত্য দেখা মেলে পুরো রাজধানীতে সব বাসেই।

এসব বাগবিতণ্ডা বা ভাড়া নৈরাজ্য দূর করার পাশাপাশি গণপরিবহনে যাত্রীদের সহজে ভাড়া পরিশোধের লক্ষ্যে রাজধানীর সব পাবলিক পরিবহনে ‘র‌্যাপিড পাস’ কার্ডের ব্যবহার কার্যক্রম পরিচালনা করতে কাজ করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ।

ইতোমধ্যে এই ‘র‌্যাপিড পাস’ কার্ডের ব্যবহার শুরু হয়েছে রাজধানীতে চলা বিআরটিসির এসি ও ডিএনসিসির বাস্তবায়িত ঢাকা চাকা বাসে। তারই ধারাবাহিকতায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ এবার রাজধানীতে চলা সব বাসে এই কার্ডের ব্যবহার করতে কাজ করছে।

এ বিষয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা বাসমালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে খুব তাড়াতাড়ি কার্যক্রম শুরু করব। র‌্যাপিড পাস কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে ভাড়া নৈরাজ্য, হঠাৎ ভাড়া বাড়ানো এসব ভোগান্তি থেকে রক্ষা পাবেন যাত্রীরা। তবে যেহেতু এখানে অনেক রুট, অনেক বাসমালিক সেহেতু এ সেবা চালু করতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। আমরা বিভিন্নভাবে বাসমালিকদের সঙ্গে আলাপ করছি, তারা সম্মতি দিলেই খুব শিগগিরই এ সেবা চালু করা সম্ভব হবে।
র‌্যাপিড কার্ড ব্যবহার বিষয়ে তিনি বলেন, কার্ডের মাধ্যমে পরিবহনে নির্ধারিত ভাড়া দেয়া যাবে। র‌্যাপিড পাস মূলত ক্রেডিট কিংবা ডেবিট কার্ডের মতো। যাত্রী বাসে ওঠার সময় কার্ডটি বাসে রাখা মেশিনের সঙ্গে পাঞ্চ করলে সবুজ বাতি জ্বলে উঠবে। আবার যাত্রী যখন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে নামবেন তখন আবার কার্ড পাঞ্চ করলে নির্ধারিত গন্তব্য অনুযায়ী কার্ড থেকে ভাড়া কেটে নেয়া হবে। সেই কার্ড আবার রিচার্জ করা যাবে। বর্তমানে বিআরটিসির ২৫টি এসি বাস ও ঢাকা-চাকা পরিবহনে এই কার্ড ব্যবহারের সুযোগ আছে। পর্যায়ক্রমে বেসরকারি গণপরিবহনে ব্যবহার বিষয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

পাবলিক পরিবহনে র‌্যাপিড পাস কার্ড ব্যবহারের উদ্যোগ বিষয়ে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ বলেন, পরিবহনে আরও শৃঙ্খলা আনতে আমরাও চাই গণপরিবহনে এমন কার্ডের ব্যবহার হোক। এটা আসলেই ভালো উদ্যোগ। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ যদি গণপরিবহনে র‌্যাপিড পাস কার্ড চালু করতে চায় সেক্ষেত্রে আমাদের কোনো বাধা নেই।

অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ বিষয়ে  বলেন, গণপরিবহনে র‌্যাপিড পাস কার্ড চালু আসলেই একটি ভালো উদ্যোগ। তবে সেখানে প্রতি কিলোমিটারে সরকার নির্ধারিত ভাড়া নেয়া জরুরি। যদি সেখানে সরকার নির্ধারিত ভাড়া নেয়ার ব্যবস্থা থাকে তবেই এটা কার্যকরী উদ্যোগ হবে। সেই সঙ্গে যাত্রীসাধারণ নানা ভোগান্তি-বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পাবেন।

বিআরটিসির এসি-ঢাকা চাকা বাসে জনপ্রিয়তা পেয়েছে র‌্যাপিড পাস কার্ড
বিআরটিসির এসি-ঢাকা-চাকা বাসে র‌্যাপিড পাস কার্ড চালু হওয়ার পর থেকেই যাত্রীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এই কার্ড। প্রাথমিকভাবে বিআরটিসির ২৫টি এসি বাস ও ঢাকার-চাকায় এই কার্ড ব্যবহৃত হচ্ছে।

ঢাকা চাকা বাসের কাউন্টার ম্যানেজার সোহাগ বলেন, এই কার্ড চালুর পর থেকেই যাত্রীদের কাছে এটা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অনেকেই নিবন্ধনের মাধ্যমে এই কার্ড সংগ্রহ করছেন। ইতোমধ্যে যারা কার্ড সংগ্রহ করেছেন তারা ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে কার্ড পাঞ্চ করে বাসে যাতায়াত করছেন।

এছাড়া বিআরটিসির এসি বাস এবং ঢাকা চাকা পরিবহনের জন্য ইতোমধ্যে ৬০ হাজার স্মার্ট কার্ড তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন মজুমদার।

প্রতিদিন গুলশান শুটিং ক্লাব সংলগ্ন কাউন্টার থেকে ঢাকা চাকা বাসে যাতায়াত করেন বেসরকারি চাকরিজীবী ফারজানা হক।

তিনি বলেন, র‌্যাপিড পাস কার্ড চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি এটি সংগ্রহ করেছি। এটি ভালো পদক্ষেপ, এর মাধ্যমে আর খুচরা টাকা সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হয় না। কার্ড থেকেই ভাড়া দেয়া যায়, সেই সঙ্গে কার্ডের টাকা শেষ হয়ে গেলে আবার রিচার্জ করা যায়। রাজধানীর সব বাসেই যদি এ পদ্ধতি চালু হয় তাহলে যাত্রীদের খুবই সুবিধা হবে।

গত বছরের ১০ আগস্ট গুলশান, বারিধারা, বনানী ও নিকেতন সোসাইটির উদ্যোগে চালু হয় ঢাকা চাকা পরিবহন, যার বাস্তবায়ন করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন।

র‌্যাপিড পাস কার্ড পেতে যা করতে হবে
কার্ড ব্যবহারকারীকে প্রথমে নিবন্ধন ফরম জমা দিয়ে কার্ড সংগ্রহ করতে হবে। প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দুই কার্যদিবস সময় লাগবে। ৪০০ টাকা মূল্যে কার্ডটি ক্রয় করা যাবে। প্রাথমিকভাবে রিচার্জের টাকা শেষ হয়ে গেলে ডাচবাংলা ব্যাংকের আটটি শাখা থেকে র‌্যাপিড পাস কার্ড ক্রয় এবং রিচার্জ করা যাবে।

রিচার্জ করার শাখাগুলো হলো- মতিঝিল লোকাল অফিস শাখা, মতিঝিল বৈদেশিক বিনিময় শাখা, এলিফ্যান্ট রোড শাখা, উত্তরা শাখা, বনানী শাখা, গুলশান সার্কেল-১ শাখা, গুলশান শাখা ও সোনারগাঁ জনপথ শাখা। এছাড়া নতুন বাজার, গুলশান-২, শ্যুটিং ক্লাব ও বনানী টিকিট কাউন্টার থেকে ঢাকা চাকার র‌্যাপিড কার্ড ক্রয় ও রিচার্জ করা যাবে। অন্যদিকে বিআরটিসির এসি বাসের জন্য হাউজ বিল্ডিং, বনানী, শাহাবাগ ও মতিঝিলে পাওয়া যাবে।

ক্ষতিগ্রস্ত কার্ড পুনরায় প্রদান
ব্যবহারকারী ক্ষতিগ্রস্ত কার্ড অপারেটরকে ফেরত দিয়ে পুনরায় প্রদান ফি-বাবদ ২০০ টাকা দেয়া সাপেক্ষে নতুন কার্ড নিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে অপারেটর নতুন প্রদান করা কার্ডে আগের ব্যালেন্স স্থানান্তর করে দেবেন।

হারানো কার্ড পুনরায় প্রদান
ব্যবহারকারী নতুন কার্ডের জন্য ২০০ টাকা জমা ফি এবং ২০০ টাকা পুনরায় প্রদান ফি দেবেন। অপারেটর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে নতুন প্রদান করা কার্ডে আগের ব্যালেন্স স্থানান্তর করে দেবেন।

হারানো কার্ড ফেরত
ব্যবহারকারী হারানো কার্ড ফেরত পেলে অপারেটরকে জমামূল্য ফেরত প্রদানের জন্য দেবেন। অপারেটর সত্যতা যাচাই সাপেক্ষে কার্ড নিষ্ক্রিয় করে রিফান্ড ফি-বাবদ ১০ টাকা কেটে নিয়ে কার্ডের মূল্য ফেরত দেবেন।