gazi-bhai-

যতোটা না চলচ্চিত্রের সাফল্যে তারচেয়ে বেশি অস্থিরতা, নির্বাচন, বয়কট বয়কট খেলা আর নানা সংকটে আলোচনায় ছিলো ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রি। বিশেষ করে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি বছর জুড়েই নানা কারণে হয়েছে নন্দিত ও সমালোচিত। তার মধ্যে চলচ্চিত্র পরিবার গঠনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখা, সমিতির নির্দেশ অমান্য করার জন্য পরিচালক শামীম আহমেদ রনিকে আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা, চিত্রনায়ক শাকিব খানও জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজকে বয়কট করা উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলা যায়।

সভায় নতুন বছরে প্রায় প্রতিটি বিষয়েরই অলিখিত সুরাহা হয়েছে গেল বছরের। যেমন মানব পাচারের দায়ে অনন্য মামুনের সদস্যপদ স্থগিত, শাকিব খানের নিষেধাজ্ঞা, কাজী হায়াতের সদস্যপদ ও তার নতুন ছবির নাম তালিকাভূক্তরণ, শামিম আহমেদ রনির নিষেধাজ্ঞা, বাপ্পারাজের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেল বেশ কয়েকটি ঘটনার সুরাহা না হওয়ায় ভুগছেন অনেকেই। এই ভুক্তভোগীদের অন্যতম হচ্ছেন ‘প্রেমের তাজমহল’ ছবির নির্মাতা গাজী মাহবুব। পরিচালক সমিতি কর্তৃক এখনও নিষিদ্ধ হয়ে আছেন তিনি। কারণ গত বছর পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন ঢাকাই ছবির নায়করাজ রাজ্জাককে অসম্মান করে কথা বলায় প্রতিবাদ করেছিলেন গাজী মাহবুব। সে নিয়ে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক। এক পর্যায়ে হাতাহাতি হয়েছে বলেও খবর পাওয়া যায়। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে পরিচালক সমিতির সদস্য পদ স্থগিত করা হয় গাজী মাহবুবের।

শুধু তাই নয়, সেদিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নায়ক রাজ্জাকের পরিবারের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয় পরিচালক সমিতির। যা বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ফেলে দিয়েছিলো পরিচালক সমিতিকে। তবে নায়করাজের মৃত্যুর পর বাপ্পারাজ ও সম্রাট এফডিসিতে আসলে আবেগঘন পরিবেশে সেইসব মনোমালিন্য কেটে যায়। কিন্তু সমিতির সঙ্গে এখনও দূরত্ব কাটেনি নির্মাতা গাজী মাহবুবের।

এখনও সমিতির নিষেধাজ্ঞার কবলে এই নির্মাতা। তাই নিজের নতুন ‘ভালোবাসা ২৪.৭’ ছবিটির শুটিংও শুরু করতে পারছেন না এ পরিচালক। গেল বছরের শেষদিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে তার ছবিটি আটকে আছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন জানিয়েছিলেন, ‘পরিচালক সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভায় গাজী মাহবুবের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সে আমাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু তাকে নিয়ে সমিতির সিদ্ধান্ত জানতে হলে সমিতির আগামী মিটিং পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ওই মিটিংয়ের আগ পর্যন্ত আমরা গাজী মাহবুবের বিষয়ে কিছুই বলতে পারছি না।’

তাই অপেক্ষা ছিলো ৩০ ডিসেম্বর পরিচালক সমিতির সাধারণ সভার জন্য। সময় অনুযায়ী সেই সভা অনুষ্ঠিতও হয়। সেখানে সমিতিকে সিনেমার শুটিং আটকানোর চ্যালেঞ্জ করে সমিতি কর্তৃক অনির্দিষ্টকালীন নিষেধাজ্ঞায় থাকা পরিচালক শামিম আহমেদ রনিকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। শাকিব খানসহ অন্যান্যদের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে নমনীয় আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সুরাহা হয়নি গাজী মাহবুবের বিষয়ে। বরং ওই সভায় তার নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ এক বছরই রাখা হয়।

এ বিষয়টি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে চলচ্চিত্রপাড়ায়। এ প্রসঙ্গে পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘সভায় গাজী মাহবুবের নিষেধাজ্ঞার পরিমাণ পূর্ণ এক বছরই রাখা হয়েছে। সেই মেয়াদের প্রায় ছয়মাস চলে গেছে। নতুন করে সমিতির কোনো নিয়ম ভঙ্গ না করলে বাকি কয়েক মাস পরই সে চাইলে আবার কাজ করতে পারবেন।’

কিন্তু সমিতির ক্ষমতা ও যোগ্যতা চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস দেখিয়ে নিষিদ্ধ হওয়া রনিকে ক্ষমা করে গাজী মাহবুবের বেলায় কেন কঠিন ভূমিকা সমিতির- এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালক সমিতির সভাপতি বলেন, ‘রনির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হওয়ার পর তার কর্মকাণ্ড ও আচরণ সন্তোষজনক ছিল। এসব বিবেচনা করেই তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে সমিতি।’

এ বিষয়ে গাজী মাহবুব বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার পর আমি অসন্তোষ আচরণ করেছি বলতে সেটা কী ও কেমন জানতে চাই। আমি তো সবসময় এফডিসিতেই থেকেছি। সমিতির অনেক নেতা-কর্মী আমার বন্ধু, তাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। আমার আচরণ অসন্তোষের কী আছে? অন্যরা ক্ষমা পান, কিন্তু নায়করাজকে নিয়ে কটু কথার প্রতিবাদ করায় আমার ক্ষমা মিলে না! অন্যরা চিঠি দিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন আমিও সেইভাবেই ক্ষমা চেয়েছি। ভিন্ন তো কিছু নয়, কিংবা আমার চিঠিতে কমতির কিছু ছিলো না। তবে আমার চিঠিটি কেন আমলে নেয়া হয়নি? আমার সিনেমার কাজ আটকে আছে অনেকদিন। প্রযোজক বিরক্ত হচ্ছেন। সবাই জানেন এই মন্দার বাজারে প্রযোজক পাওয়া কতোটা কঠিন ব্যাপার। সেখানে একজন প্রযোজক বিমুখ হলে তো বিপদ। চলচ্চিত্র আমার রুটিরুজির একমাত্র জায়গা। আমি মানসিকভাবে সমস্যায় রয়েছি।সমিতি তো মেধা ধ্বংসের জন্য নয়, মেধার বিকাশে নিয়োজিত থাকার কথা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার সঙ্গে যা ঘটেছিলো সেটি নায়করাজ রাজ্জাক জীবিতকালেই সুরাহা হয়েছিল। তার বাসায় গিয়ে পরিচালক সমিতির নেতৃবৃন্দ ও আমি দেখা করে বিষয়টি শেষ করেছিলাম। তথাপিও আমার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া হচ্ছে না দেখে আমি সত্যি হতাশ হয়েছি। আমার সামনে রাজ্জাক সাহেবকে অপমান করে কথা বলা হয়েছিল। তার প্রতিবাদ করেছিলাম আমি। কারণ নায়করাজ তো আমাদের সবারই সম্মানের পাত্র। এরপর হুট করে আমার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হল। অথচ আমাকে ডেকে সমিতি কোনো কথাই জিজ্ঞেস করেনি। ওইদিন কী ঘটেছিল তার কিছুই আমার কাছ থেকে জানা হয়নি। শোকজ না করেই আমাকে নিষিদ্ধ করা হল।’

এদিকে শামিম আহমেদ রনিকে ক্ষমা করে দিলেও গাজী মাহবুবের বিষয়ে সুরাহা না হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিকে ঘিরে সমালোচনা চলছে চলচ্চিত্র পাড়ায়। অনেকেই প্রশ্ন ছুঁড়ছেন কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে সমিতির আদেশ অমান্য করে সমিতির ক্ষমতা ও যোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো ‘বেয়াদবি’ করেও ক্ষমা পান রনি? তার শক্তির উৎস কী? সেই জবাবে বেশ কিছু নাম উচ্চারিত হচ্ছে। শিগগিরই রনির নতুন ছবির শিল্পী-কলাকুশলীদের নাম ঘোষণার পর তার শক্তির উৎসের বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আবার অনেকেই জানতে চাইছেন, নায়করাজকে নিয়ে কটুকথা কিংবা একটি ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা থেকে নিষিদ্ধ হওয়া গাজী মাহবুব কেন ক্ষমা চেয়েও পার পাচ্ছেন না, কমছে না শাস্তির পরিমাণ। নতুন বছরে যেহেতু পরিচালক সমিতি পুরনো সব মন্দ অভিজ্ঞতা ভুলে গিয়ে নতুন করে শুরু করতে চাইছে, সেহেতু সেই শুরুর অধিকার ও সুবিধা সব সদস্যদেরই সমানভাবে পাওয়া উচিত বলে মনে করেন চলচ্চিত্র নির্মাতারা।