বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়নে ছাড়ের অপেক্ষায় থাকা বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ রেকর্ড ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বিগত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে দাতাদের অর্থ ছাড়ের পরিমাণও বেড়েছে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ইআরডির অতিরিক্ত সচিব ফরিদা নাসরিন মঙ্গলবার বলেন, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার দাতাদের সঙ্গে যেসব চুক্তি করেছে, দাতাদের সেই প্রতিশ্রুত অর্থের মধ্যে ৪০ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার পাইপলাইনে পড়ে আছে।

বাংলাদেশের চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মোট বাজেটের আকার ৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি (৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা)। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী (১ ডলারে ৮১ টাকা হিসাবে) বাংলাদেশি মুদ্রায় পাইপলাইনে থাকা অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতিবছর দাতাদের সঙ্গে যেসব ঋণ চুক্তি হয়, সে অর্থ খরচ করতে না পারায় অতিরিক্ত অর্থ পাইপলাইনে জমা হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দাতাদের সঙ্গে চুক্তি করায় প্রতিবছর দাতাদের প্রতিশ্রুত অর্থের আকার বাড়ছে। অতিরিক্ত সচিব ফরিদা নাসরিন বলেন, গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং চীনের সঙ্গে পদ্মাসেতু রেলসংযোগ প্রকল্পের চুক্তি হওয়ায় পাইপলাইনের আকার এত বেড়েছে।

রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়া প্রায় ১২০০ কোটি ডলার এবং পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের জন্য চীন ৩১৫ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে বলে জানান তিনি। পাইপলাইনের অর্থ ব্যয় বাড়াতে চলতি অর্থবছরের শুরুতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রধান করে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে সদস্য সচিবের দায়িত্বে থাকা ফরিদা নাসরিন বলেন, তারা ইতোমধ্যে বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও প্রকল্প পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকের পর থেকে প্রকল্প সহায়তা খাত থেকে অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ বৈদেশিক অর্থ ছাড় হয়েছে বলে জানান তিনি। এই চার মাসে দাতাদের কাছ থেকে প্রায় ১৪৬ কোটি ডলার ছাড় করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। এর মধ্যে অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে ৯ কোটি ২৩ লাখ ডলার, আর ঋণ হিসেবে এসেছে প্রায় ১৩৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ছাড় হয়েছিল মাত্র ৭৪ কোটি ৪৫ লাখ ডলার।

ফরিদা নাসরিনে বলেন, বড় প্রকল্পগুলোতে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করলে দাতাদের প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড় বেড়ে পাইপলাইনের আকার কমবে। পাইপলাইন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত পুঞ্জিভূত পাইপলাইনের আকার ছিল প্রায় ২ হাজার ২০৭ কোটি ডলার। এরপর গত অর্থবছরেই পাইপলাইনে যুক্ত হয় ১ হাজার ৪৩৬ কোটি বা ১৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। ওই অর্থবছরে দাতাদের সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের চুক্তি হয়, যার মধ্যে ছাড় হয় মাত্র ৩৬০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের অক্টোবর পর্যন্ত দাতাদের সঙ্গে প্রায় ৫৬৫ কোটি ডলারের চুক্তি হয়েছে। সব মিলে পাইপলাইনের আকার ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অতিরিক্ত সচিব ফরিদা নাসরিন বলেন, “চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আমরা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ছাড় করতে পেরেছি। এ সফলতা বছরের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করা সম্ভব।”

চলতি অর্থবছরে দাতাদের কাছ থেকে ৬০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি আদায় এবং ৭১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার ছাড়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম চার মাসে দাতাদের পুঞ্জিভূত পাওনা থেকে পরিশোধ করা হয়েছে ৪৫ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের প্রথম চার মাসে পরিশোধ করা হয়েছিল ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ডলার।