rohinga

রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে সাময়িক আশ্রয় পেলেও তাদের তাড়া করছে দুঃসহ স্মৃতি। স্বজন-সহায়হারা রোহিঙ্গাদের অনেকে এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। কেউ কেউ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন। গত কয়েক দিনে উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী ক্যাম্পগুলো ঘুরে এমন অনেককেই দেখা গেছে।
সহায়-সম্বল হারিয়ে রাতারাতি শরণার্থীতে পরিণত হওয়ার বিষয়টি পর্যুদস্ত করে দিয়েছে তাদের। কিন্তু সীমিত পরিসরে শারীরিক চিকিৎসা পেলেও, অশান্তি তাড়া করছে তাদের। কেউ কেউ হারিয়ে ফেলেছেন মানসিক ভারসাম্য। গত ২৫শে সেপ্টেম্বর। উখিয়ার লম্বাশিয়া এলাকা। একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল এক রোহিঙ্গা যুবককে। উগ্র বৌদ্ধরা পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে তাকে। শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল রক্ত। বিড়বিড় করে প্রলাপ বকে যাচ্ছিল।
অপর রোহিঙ্গা যুবক মো. করিম ঘটনার বিস্তারিত জানান। করিম রাখাইন প্রদেশের বুথেডংয়ের খিয়াম্বু লাম্বার পাড়ার বাসিন্দা আমীর হামজার ছেলে। আবদুল খালেক তারই প্রতিবেশী। করিম মানবজমিনকে বলেন, এই যুবকের নাম আবদুল খালেক। বয়স ৩৫। পালিয়ে গত ২১শে সেপ্টেম্বর আমরা লম্বইর ঢালায় আসি। বাংলাদেশে আসার পথে সেখানে পেছন থেকে হামলা করে রাখাইন উগ্র বৌদ্ধরা। তার সামনেই তার মা নুরুজ্জাহান (৫০) ও স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করে। সেখানে ১৫ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার তিন শিশু সন্তানও নিখোঁজ। এরপর গত ২৪শে সেপ্টেম্বর উখিয়ার পুঠিবনিয়া দিয়ে এদেশে আসি। ওইদিন থেকেই সে পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে। পাগলামী করায় তার এক ভাই তাকে বেঁধে রাখে। এর ৯ দিন আগে গত ১৬ই সেপ্টেম্বর। টেকনাফের কানজর পাড়া। যাত্রী উঠানোর জন্য একটি মাইক্রোবাস থামে। দরজা খুলতেই নেমে দৌড় দেন এক নারী। কয়েকজন জোর করে ধরে তাকে আবার গাড়িতে ওঠায়। গাড়িতে তার পাশেই বসা স্বামী জাফর আলম। তার কোলে ২ মাসের শিশু সোহাইল। কিন্তু নিজের সন্তানকে এখন চিনেন না মা দিল দোহার। তিনি নিজ মনে নিজের আঞ্চলিক ভাষায় প্রলাপ বকতে থাকেন, ‘আমার দেশের সবাইকে কেটে ফেলছে। সবাইকে শহীদ করে দিচ্ছে। আমার দেশ আমিই চালাবো। যাদের জবাই করেছে তাদেরকে আমার কাছে এনে দাও।’ বলতে বলতেই কথা অস্পষ্ট হয়ে যায়। বার বার আঙুল দিয়ে গলাকাটার অঙ্গভঙ্গি করতে থাকেন।
মংডুর বলিবাজারের হাতিপাড়ার বাসিন্দা জাফর আলম বলেন, গত ২৫ আগস্ট বর্মী সেনারা আমাদের গ্রামে ঢুকে। নির্বিচারে গুলি ও জবাই করে চোখের সামনে ৫ প্রতিবেশীকে হত্যা করতে দেখি। প্রাণ নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিই। এরপর জীবন বাঁচাতে গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের দিকে রওনা দিই। তারপর চিনগিরি পাড়ায় এক রাত কাটিয়ে হেঁটে তুরাইনে আসি। সেখানে গলাকাটা, ক্ষতবিক্ষত, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন অন্তত ৩০ নারী-পুরুষ-শিশুর লাশ দেখি আমরা। আসার পথে কিয়াম্মাই এবং কুমিরখালীতেও ক্ষত-বিক্ষত লাশ দেখি। রওনার এক সপ্তাহ পর আমরা হোয়াইক্যং দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকি। এরপর থেকে স্ত্রী দিল দোহার পাগলামী করছে। প্রলাপ বকছে। ঘরে রাখতে পারছি না। ওই স্মৃতি মনে পড়লে আমি নিজেও যেন অস্বাভাবিক হয়ে পড়ি। তাই একটি মাজারে খাদেমের কাছে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসি।
ডাক্তারের কাছে না পাঠিয়ে নিজেই চিকিৎসা করছেন কেন জানতে চাইলে স্থানীয় মাজারের খাদেম ছৈয়দ আমিন বলেন, এসব ডাক্তারের অসুখ না। আমার চিকিৎসায় ভালো হবে।
গত ১৯শে সেপ্টেম্বর। উখিয়ার গয়ালমারা। এক যুবতী কিছুক্ষণ পর পর চিৎকার করে উঠছে। ‘আগুন, আগুন। মিলিটারি, মিলিটারি। গুলি করছে। জবাই করছে।’ বলেই চিৎকার জুড়ে দিচ্ছে। নাম-ঠিকানা জিজ্ঞেস করলেই বলছে, ‘আমি বাংলাদেশে পৌঁছে গেছি। আমি তোমাদের ডাক্তার দেখাব। জোড়া লাগাবো। ভালো করবো।’
গয়ালমারার স্থানীয় এক যুবক বলেন, ওই নারীর নাম ছেনুয়ারা বলে শুনেছি। তার সামনেই পিতা-মাতাসহ পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে কয়েকজন রোহিঙ্গা। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাংলাদেশে এসেছে। কিন্তু মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই ডেকে নিয়ে তাকে ভাত খেতে দিয়েছি।
মংডুর সিকদার পাড়ার পনের বছরের কিশোরী হামিদা। ২৫ আগস্ট বর্মী সেনার হিংস্রতায় গুলিতে মারা গেছে তার পিতা হোছন আহমদ (৬০), ভাই রেজা আহমদ (২১) ও নজিমুল্লাহ (১৮)। আর নিখোঁজ রয়েছে, বোন উম্মে খাইর (২৫), মহুয়া (২০), ওসমান গণি (১২), ইব্রাহিম (৯) ও আনাছ (৮)।
তার চাচা সোনা আহমেদ বলেন, পরিবারের তিনজনকে মরতে দেখে ও বাকিদের খুঁজে না পেয়ে হামিদা বাকরুদ্ধ। বুকের ভেতর জ্বলছে জ্বলছে বলে কেঁদে উঠে। পাগলামী করছে। কিছুতেই তাকে শান্ত করতে পারছি না।
শুধু আবদুল খালেক, দিল দোহার, ছেনুয়ারা বা হামিদা নয়। মিয়ানমারে বর্মী সেনার বীভৎসতা দেখে ও তাতে স্বজন হারিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন আরো বহু রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। বর্বর হত্যাকাণ্ড, ক্ষত-বিক্ষত লাশ, আগুনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, স্বজন হারানো, এক রাতে নিঃস্ব শরণার্থীতে পরিণত হওয়ায় বাংলাদেশে আসা হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেকেই ঘুমাতে পারছেন না। চোখ বুজলেই তাড়া করছে সেই দুঃস্বপ্ন। এলোমেলো হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবন।