payra

রামনাবাদ নদীর তীরে চালু হয়েছে দেশের তৃতীয় আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর পায়রা। কৃষি আয় দিয়ে জীবন ধারণে অভ্যস্ত দেশের মধ্য উপকূলের বাসিন্দারা সমুদ্রবন্দর আর শিল্পায়নের গল্প এতদিন শুনলেও এখন স্বপ্ন দেখছেন সিঙ্গাপুরের মতো নগর জীবনের। কিন্তু ড্রেজিংয়ের (খনন) কাজ দেরি হওয়ায় পায়রা বন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা স্বপ্ন ফিকে হয়ে যেতে বসেছে।

সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সভাকক্ষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শাজাহান খানের সভাপতিত্বে এ প্রকল্পের অগ্রগতির পর্যালোচনা সভা হয়। সভায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সচিব অশোক মাধব রায় বলেন, বন্দরের ড্রেজিং অগ্রগতি খুবই মন্থর। এ বিষয়ে আরও উদ্যোগী ও তৎপর হতে হবে।

খনন কাজ সঠিক সময়ে না হলে এ বন্দরের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না বলেও মত দেন তিনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান পায়রা বন্দরে প্রয়োজনীয় ড্রেজিং যথাসময়ে সম্পন্নের নির্দেশ দেন।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পায়রা বন্দরের মূল চ্যানেল রক্ষণাবেক্ষণে ড্রেজিং করতে বেলজিয়ামের কোম্পানি জান ডি নুলের সঙ্গে গত বছরের ২৫ মে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে। কিন্তু এক বছর পার হলেও চুক্তিই শেষ করতে পারেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এমওইউ’র পর ওরা আমাদের আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব দিয়েছে। এসবের মূল্যায়ন চলছে।

তিনি বলেন, যেকোনো একটি বড় প্রজেক্টে অনেকগুলো মন্ত্রণালয় জড়িত। শুধু ড্রেজিংই প্রায় চার হাজার কোটি টাকার। এসব কাজের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে একেকটি কাজ পাস হতে অর্থাৎ ফাইল উপরে উঠতে আর নিচে নামতে ১৫-২০ দিন লেগে যায়। এখানে আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, ইআরডিসহ চার-পাঁচটি মন্ত্রণালয় জড়িত। ড্রেজিংয়ের কাজ দ্রুত করতে আমরা মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রণালয়ে দৌড়াচ্ছি।
‘যেহেতু প্রজেক্টটা অনেক বড়, টাকার পরিমাণও বেশি। তাই টাকাটা কোথা থেকে আসবে, এসব কাজে একেকজন একেক ধরনের প্রশ্ন তোলেন। এসব প্রশ্নের জবাব আমাদেরই দিতে হয়।’

আশা করছি আগামী দুই বছরে আমরা প্রয়োজনীয় ড্রেজিংয়ের কাজ সম্পন্ন করতে পারব- যোগ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট বাংলাদেশের তৃতীয় বাণিজ্যিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে পায়রায় বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণ সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকারের ১০টি বড় প্রকল্পের একটি। ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর ১৬ একর জমির ওপর এই বন্দর স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়। জায়গাটি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালী ইউনিয়নে, রামনাবাদ নদীর পশ্চিম তীরে। ২০৩০ সালের মধ্যে বন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনটি পর্বে এ কাজ সম্পন্ন হবে। এ জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১০০ থেকে দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য পায়রা বন্দর নির্মাণের ঘোষণা দিলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা আশায় বুক বাঁধেন। এ অঞ্চলের অন্য সমুদ্রবন্দর মংলা কোনো সময়ই দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। বিশেষ করে মংলার প্রধান চ্যানেলে পশুর নদের দু’তীর ঘেঁষে সুন্দরবন থাকার পাশাপাশি ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগে পিছিয়ে পড়ায় মংলা দিনের পর দিন বাণিজ্যের আস্থা হারিয়েছে।
তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা ঘিরে সেই আস্থা ফের জেগে উঠেছিল। বিশেষ করে সুন্দরবন এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্য শিল্পকারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে হয় পরিবেশ অধিদফতরের। ইতোমধ্যে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ ঘিরে সমালোচনা ও আন্দোলন শুরু হয়েছে। কিন্তু পটুয়াখালীর পায়রায় সেই সঙ্কট নেই। তবে এ বন্দরের প্রধান ও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ নটিক্যাল মাইলের ড্রেজিং।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতোমধ্যে পায়রায় বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের একটি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০১৯ সালে উৎপাদনে যাবে। এর বাইরে এখানে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন, রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পৃথকভাবে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কোম্পানিগুলোর জমি অধিগ্রহণ ছাড়াও যৌথ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের চেষ্টা চলছে।

পায়রা বন্দর ঘিরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ কর্পোরেশন- পেট্রোবাংলা এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এছাড়া কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি পায়রা বন্দরের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে এলএনজি (তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল নির্মাণের জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে। কিন্তু সব উদ্যোগই ব্যর্থ হবে যদি সময় মতো পায়রা বন্দরের ড্রেজিং কাজ সম্পন্ন না হয়।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, আমরা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ড্রেজিংয়ের কাজ শেষ করার নিশ্চয়তা চেয়েছি। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ তা দিতে পারছে না। তারা বলছেন, তাদের ড্রেজিংয়ের আশায় আমরা প্রকল্প তৈরি করলাম কিন্তু ড্রেজিংয়ের কাজ শুরুই হলো না। সেক্ষেত্রে বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়বে।
বন্দরে ড্রেজিং না হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লা আনতে হবে লাইটার জাহাজে। এতে কয়লা পরিবহনে বাড়তি খরচ পড়বে। ফলে বিদ্যুতের দামও বেশি পড়বে। আবার এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য অন্তত ১৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজকে (জাহাজের পানির অংশের গভীরতা) বন্দরে ভিড়তে হবে। কয়লার ক্ষেত্রে লাইটার দিয়ে কাজ সম্পন্ন হলেও এলএনজির ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরাসরি টার্মিনালেই জাহাজ আনতে হয়। বিকল্প হচ্ছে সাগরের মধ্য দিয়ে পাইপলাইন নির্মাণ করা। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অধিক ব্যয়ের কারণে প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়বে, বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ হারাবেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাগরের মধ্য দিয়ে পাইপলাইন নির্মাণ করতে অন্তত ১০০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ হবে। আবার নয় বছর পর ড্রেজিং শেষ হলে এ পাইপলাইনও আর কোনো কাজে আসবে না।

এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, এখন বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম তুলনামূলক অনেক কম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়লার চেয়েও কম দামে এলএনজি পাওয়া যেতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ১০ বছর অন্তত এলএনজির একই দর বজায় থাকবে। এটি সুবিধাজনক ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় অনেক দেশই গ্যাসের স্বল্পতায় এলএনজি ব্যবহার করছে।

এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসহ দেশের তৃতীয় এ বাণিজ্যিক সমুদ্রবন্দরের সুষ্ঠু পরিচালন ও সংরক্ষণের জন্য নিয়মিতভাবে খনন (মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং) জরুরি বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা।