ইসলাম ধর্মের দুটি প্রধান উৎসব বা পর্ব হলো পবিত্র ঈদুল ফিতর ও পবিত্র ঈদুল আজহা। রমজানের এক মাস আত্মশুদ্ধির পর পয়লা শাওয়াল ঈদুল ফিতর উদযাপন করা হয়। আর জিলহজ মাসের দশ তারিখ হজ উপলক্ষে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ পালন করা হয়। ঈদুল ফিতর আনন্দ-খুশির আর ঈদুল আজহা আত্মত্যাগের পর্ব হিসেবে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

ঈদুল আজহার এই পবিত্র দিনে আমরা পরম সৃষ্টিকর্তার নৈকট্যলাভের জন্য সচেষ্ট হই এবং হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যে আত্মত্যাগ ও মহান আদর্শ পৃথিবীর বুকে স্থাপন করে গেছেন তা অনুসরণের শপথ নেই। ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির একটি অন্যতম ভিত্তি হলো হজ। মূলত মুসলিম মিল্লাতে পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে কেন্দ্র করেই হজের নানা ঘটনাবলি। কোরবানি তার মধ্যে একটি। হজ মালেকে নেছাব অর্থাৎ সামর্থ্যবান মুসলিমরা পালন করেন, কিন্তু কোরবানি যেকোনো ধর্মপ্রাণ মুসলমান দিতে পারেন এবং এর রয়েছে কিছু নিয়মনীতি।

ঐশীগ্রন্থ পবিত্র কোরআনুল করিমে আল্লাহপাক সূরা হজে বলেছেন: আমার নিকট পশুর মাংস, হাড়-গোড়, রক্ত ইত্যাদি কিছুই পৌঁছায় না, পৌঁছায় শুধু তোমাদের অন্তরের তাকওয়া অর্থাৎ ভয়-ভীতি।

পরিষ্কার কথা: আমরা কোরবানির মাধ্যমে কে কতটুকু আত্মত্যাগ এবং খোদাভীতির পরিচয় দিচ্ছি এবং সৃষ্টিকর্তার পবিত্র আদেশ কতটুকু পালন করছি, তা তিনি প্রত্যক্ষ করেন।

অনেককাল আগে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) বিধাতার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে প্রাণাধিক পুত্রকে নিজ হাতে কোরবানি দিতে সম্মত হয়েছিলেন এবং উদ্যত হয়েছিলেন, গলায় ছুরিও চালিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালার পরম ইচ্ছায় সেদিন একটি প্রাণী জবেহ হয়েছিল। প্রিয় বস্তু আল্লাহর নামে উৎসর্গ করার পরীক্ষায় হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তার স্মরণেই কোরবানি। সেই অবিস্মরণীয় ত্যাগের শিক্ষাকে অক্ষুণœ রাখার উদ্দেশ্যে সৃষ্টিকর্তার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও প্রেমের পরাকাষ্ঠার নিদর্শনস্বরূপ আমরা প্রতিবছর ঈদুল আজহা অভাবীদের শেয়ার করে পালন করে থাকি।

পবিত্র হজের অন্যান্য ঘটনার মতো কোরবানিরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ছিলেন একেশ্বরবাদী। তাঁর মাধ্যমেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তায়ালা কোরবানির প্রথা চালু করেন। ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহকে প্রচ-ভাবে অন্তর দিয়ে ভয় করতেন এবং বিশ্বাস করতেন। একবার নির্দেশ হলো ইব্রাহীম (আঃ)কে প্রিয় বস্তু আল্লাহর নামে উৎসর্গ বা কোরবানি দিতে হবে। ইব্রাহীম (আঃ) তাই করলেনÑ কোরবানি দিলেন বহু সংখ্যক বকরী। কিন্তু তাতেও বিধাতা খুশি হলেন না। তিনি আবার নির্দেশ দিলেন সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি দাও। এবারও তিনি বহু সংখ্যক উট, দুম্বা ও মেষ কোরবানি দিলেন। এবারও আল্লাহ পাকের সেই ঐশী নির্দেশ। এবার ইব্রাহীম বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবং ভাবলেন তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কী? অহংবোধ ও স্বার্থপরতা তাঁকে আঁকড়ে ধরেছে। তাঁর বিশ্বাসে গভীর আত্মত্যাগ নেই। অবশেষে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সন্তানরাই তার প্রাণাধিক প্রিয় বস্তু। তাদের কাউকে উৎসর্গ করলেই আল্লাহপাক খুশি হবেন। করলেনও তাই। এক পুত্রের চোখ বেঁধে যখন ইব্রাহীম (আঃ) তার গলায় ছুরি চালাতে উদ্যত, তখনই ঐশী আওয়াজÑ থাম ইব্রাহীম, আমি তোমার এবারের ত্যাগে মুগ্ধ হয়েছি। আমি ইচ্ছার ঐকান্তিকতা ও সংকল্পের দৃঢ়তাই পরীক্ষা করছিলাম। তুমি সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ। ইব্রাহীম নিজে বাঁধা চোখ খুলে দেখেন তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছে কিশোর পুত্র ইসমাইল এবং জবেহ হয়েছে একটি পশু দুম্বা। ইব্রাহীমের আত্মত্যাগের এই পরীক্ষায়ই ঈদুল আজহায় স্মরণ করা হয়। আমাদের উচিত তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হওয়া এবং আল্লাহপাকের বিধিবিধানসমূহ মনেপ্রাণে গ্রহণ করা।

আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে ঈদুল আজহা ধর্মীয় রীতি-নীতি পালনের পাশাপাশি বরাবর আনন্দ দিয়ে থাকে। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে, ছোট-বড় ধনী-গরিব এককাতারে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার যে দৃষ্টান্ত ঈদপর্বে পরিলক্ষিত হয়, তা অন্য কোনো ধর্মীয় উৎসবে দেখা যায় না। ঈদুল আজহার শিক্ষাই হয়েছে আত্মত্যাগে উজ্জীবিত হওয়া, মানবিক কল্যাণ সাধন করা এবং সৌহার্দ্যরে বন্ধনকে সুদৃঢ় করা।

প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের জন্য আনন্দ বার্তা বয়ে আনে ঠিকই। কিন্তু কোরবানির সঠিক নিয়ম-কানুনগুলো আমরা যথাযথভাবে অনুসরণ করি না। কোরবানির একটি অংশে প্রকৃত হকদারকে প্রদান করি না। অথচ কোরবানির শিক্ষাই হচ্ছে ত্যাগ ও উৎসর্গের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। আবার প্রতিযোগিতামূলক রক্তক্ষরণও কোরবানির মাহাত্ম্যকে নষ্ট করে দেয়। আসুন, আমরা কোরবানির বিধিবিধান মেনে আত্মত্যাগে উজ্জীবিত হই।