abul

পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলার পর গত কয়েক বছর ধরে হেনস্থার স্বীকার হতে হয়েছে জানিয়ে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন বলেছেন, তিনি যে নির্দোষ তা কানাডার আদালতে প্রমাণ হয়েছে। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থান্বেষী একটি মহল ষড়যন্ত্র করেছিল।

পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আনা মামলার আসামিদেরকে খালাস দিয়ে কানাডার একটি আদালতের রায় প্রকাশ হয়েছে স্থানীয় সময় শুক্রবার। বাংলাদেশে শনিবার সকালে এই রায়ের কথা প্রচার হয়।

ওই রায়ে বিশ্বব্যাংকের আনা দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগকে গালগপ্প, অনুমানভিত্তিক, গুজব, শোনা কথা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বিচারক অন্টারিও সুপ্রিম কোর্টেও বিচারক ইয়ান নরডেইমার।

বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগ আনার সময় বাংলাদেশের যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন আবুল হোসেন। কিন্তু নানা ঘটনাপ্রবাহের পর তিনি তখন পদত্যাগ করেছিলেন।

কানাডার আদালতের রায় প্রকাশের পর ‘কানাডার আদালতে পদ্মা সেতুর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার প্রেক্ষিতে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন-এর বক্তব্য’ শিরোনামে একটি বক্তব্য পাঠানো হয় গণমাধ্যমে।

আবুল হোসেন বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ- কানাডার আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে এসএনসি-লাভালিনের অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তা মামলা থেকে রেহাই পেলেন। কানাডার আদালতের এই রায় প্রমাণ করে, পদ্মাসেতু নিয়ে আমাকে জড়িয়ে বিশ্বব্যাংক যে অভিযোগ করা হয়েছে- তা সর্বৈব মিথ্যা।’

আবুল হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশস্থ তৎকালীন বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি গোল্ড স্টেইন এবং বাংলাদেশের কতিপয় পত্রিকার অসত্য রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাংক যে কাল্পনিক অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করেছিল- তা ছিল শুধু মিথ্যা নয়, ষড়যন্ত্রমূলক। আমি বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশি কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি।’

সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ‘এ ষড়যন্ত্র আমার দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম, মর্যাদা, সততা, নিষ্ঠার ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালনের পথকে বাধাগ্রস্ত করেছে। আমাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করা হয়েছে।’

আবুল হোসেন বলেন, “বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্টের সাথে আমার চীনের এক আন্তর্জাতিক ফোরামে সাক্ষাৎ হয়। তিনি তখন বলেছিলেন- ‘আমি বুঝতে পারছি- পদ্মা সেতু ও আপনি ষড়যন্ত্রের শিকার। বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও বিশিষ্ট কতিপয় লোকের কথায় প্রভাবিত হয়েছেন। এ জন্য আমি অনুতপ্ত’।”

আবুল হোসেন বলেন, ‘আমার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সাকোকে মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে জড়ানো হয়েছে, পরামর্শক নিয়োগে ৩৭ মিলিয়ন ডলার দর প্রস্তাবের ৩৫ মিলিয়ন ডলার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে, টক শোতে এই বিষয় নিয়ে বিশিষ্টজনরা রাতের ঘুম হারাম করে আলোচনায় অংশ নেন- তা ছিল মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক।’

সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে এসে বিশ্বব্যাংকের আইন উপদেষ্টা ওকাম্পো যে আইন বিরোধী লম্ফঝম্ফ দেখালেন, সরকার, পদ্মাসেতু এবং আমার বিরুদ্ধে যে মিথ্যাচার করলেন- তা ষড়যন্ত্রের ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।’

নিজের মন্ত্রিত্ব হারানো এবং তার মন্ত্রণালয়ের সচিবকে কারাগারে যাওয়ার বিষয়টি নিয়েও কথা বলেন আবুল হোসেন। বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মিথ্যা অভিযোগে আমাকে, আমার পরিবারকে হেনস্থা হতে হয়েছে। সরকারের সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বিনা দোষে জেল খাটতে হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রে পদ্মা সেতু নির্মাণের স্বার্থে আমাকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছে। আমাকে জনগণের কাছে ছোট হতে হয়েছে। কানাডায় আমার জামাতার ব্যাংক হিসাব চেক করা হয়েছে। ঘনিষ্ট আত্মীয় স্বজনসহ আমার সব ব্যাংক একাউন্ট তদন্ত করা হয়েছে।’

সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ‘যে সব মিডিয়ার মিথ্যা রিপোর্ট, অতিশয় বাড়াবাড়ি লেখা, কার্টুন প্রকাশ, সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয় লেখায় প্রভাবিত হয়ে- বিশ্ব ব্যাংকের দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আমাকে অভিযুক্ত করা হলো, আমার মর্যাদা ক্ষুন্ন হলো- তাদের আজকের জবাব কি?’।

আবুল হোসেন বলেন, ‘কতিপয় পত্রিকা শুধু পদ্মাসেতু নিয়ে মিথ্যা রিপোর্ট করেছে তা নয়, পত্রিকাগুলো আমার মন্ত্রিত্বকালীন কাজ নিয়ে, সড়ক দুর্ঘটনার সাথে আমাকে জড়িয়ে মন্ত্রীর পদত্যাগ চাই, আমার ব্যক্তিগত পাসপোর্ট নিয়ে, আমার গ্রামের বাড়ি নির্মাণ নিয়ে, যোগাযোগ মন্ত্রীর গাড়ি ক্রয় নিয়ে, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক নির্মাণের সার-সংক্ষেপ নিয়ে, বিএনপির শ্বেতপত্রের প্রমাণিত মিথ্যা বিষয় নিয়ে, আওয়ামী লীগ থেকে আমি পদত্যাগ করেছি- এই মর্মে আমার স্বাক্ষর জাল করে একটি চিঠি পত্রিকায় প্রকাশ করে- যা ছিল উদ্দেশ্যমূলক।’

আবুল হোসেন বলেন, ‘আমি জীবনে সৎ থেকে, ব্যবসা করে অর্থ উপার্জন করেছি, জনগণের জন্য ব্যয় করেছি। আমার আফসোস, পদ্মা সেতুতে মিথ্যা অভিযোগে ২০১৩ সালে পদ্মা সেতু চালু করার প্রক্রিয়া দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে বিলম্বিত হলো।’

আবুল হোসেন বলেন, ‘আমি তখন বলেছিলাম- পদ্মা সেতুর অভিযোগে আমি অভিযুক্ত নই, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আজ কানাডার আদালতের মাধ্যমে আমার সততা উচ্চকিত হলো। আমি নির্দোষ প্রমাতি হলাম।’

আবুল হোসেন বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের চাপে পদ্মাসেতু ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ দুদক ২০১২ সারের ডিসেম্বরে মামলা করে এবং প্রায় দুই বছরে তদন্ত শেষে অভিযোগের কোন সত্যতা পায়নি। কানাডার আদালতে শেষাবধি পদ্মা সেতুতে কোন দুর্নীতি খুঁজে পায়নি। পদ্মা সেতু নির্মাণে আমি দ্রুততার সাথে কাজ করেছিলাম। অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলাম। আমার সময়ে প্রণীত ডিজাইন ও দরদাতা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অনুমোদন দিয়ে বর্তমানে পদ্মাসেতু নির্মিত হচ্ছে। আমার সময়ে গৃহীত মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলছে- দেশ সেসব প্রকল্প নিয়ে এখন গর্ব করে।’

আবুল হোসেন বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক ও স্থানীয় ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করে ইতিহাস গড়লেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা আবারও প্রমাণ করলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। ’

সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ‘যে সব পত্রিকা মিথ্যা রিপোর্ট করেছে, বিশ্বব্যাংকের  মিথ্যা অভিযোগে সহায়তা দিয়েছে, আমার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেছে, যারা পদ্মাসেতু নির্মাণকে বিলম্বিত করেছে- তাদের আল্লাহ যেন সত্যের পথ দেখান।’